কুশল প্রশ্নোত্তর: প্রজ্ঞা ও করুণা - ভদন্ত এস. ধাম্মিকা


..............................................................................................................................................................................................
প্রশ্নঃ-প্রজ্ঞা ও করুণার কথা বৌদ্ধধর্ম দেশনায় প্রায় শোনা যায়। প্রজ্ঞা-করুণা বলতে কি বুঝায়?
উত্তরঃ ভালোবাসা ও করুণাকে কোন কোন ধর্মে সর্বশ্রেষ্ঠ গুণাবলী বলে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ থাকে না। প্রজ্ঞা ছাড়া ভালোবাসা ও করুণায় গুণান্বিত হয়ে আপনি একজন সহৃদয় ব্যক্তি হতে পারেন বটে, কিন্তু অবোধ থেকে যাবেন। কারণ প্রজ্ঞার অভাবে আপনার মধ্যে নানা বিষয় সম্পর্কে বিচার বুদ্ধির অভাব থেকে যাবে। বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তির কাছে করুণা-ভালোবাসার মতো কোমল অনুভূতি গুলোর গুরুত্ব নেই। এতে প্রকৃতপক্ষে একজন বিজ্ঞানী হৃদয়বৃত্তি বর্জিত রোবোটে পরিণত হন। বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত প্রযুক্তি মানুষের সেবা না করে শোষণ ও শাসনে ব্যবহৃত হতে থাকে। এর প্রমাণ মেলে বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে জীবাণু মারণাস্ত্রের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরী করার মধ্যে। আধুনিক বস্তুবাদী দর্শনে যুক্তি, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি ও মেধাকে ভালোবাসা, করুণা ও মৈত্রীর প্রতিপক্ষ বিষয় রপে অপব্যাখ্যা করা হয়। ফলে বুদ্ধিবৃত্তির সংঙ্গে হৃদয়বৃত্তির সমন্বয় ঘটে না। এতে যেখানে বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়েছে, সেখানে ধর্ম মূল্য হরিয়েছে। বৌদ্ধ দর্শনের মতে একজন প্রকৃত বিজ্ঞ মানুষের মধ্যে হৃদয়বৃত্তির ভলোবাসা ও করুণার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে হবে। বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা ও করুণার মধ্যে সমন্বিতি গুরুত্ব আরোপনের ফলে বিজ্ঞানের সঙ্গে বৌদ্ধ দর্শনের কোন সংঘাত ঘটে না। দৈনন্দিন জীবনে কায়মনো বাক্য দ্বারা সকল কর্মে কাম-ক্রোধ-লোভ-দ্বেষ বর্জন এবং মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষা গুণাবলী অর্জনের অনুশীলন হলো প্রকৃতপক্ষে প্রজ্ঞা ও করুণার মর্মবাণী।
প্রশ্নঃ- বৌদ্ধ দর্শন মতে প্রজ্ঞা বলতে কি বোঝায়?
উত্তরঃ বৌদ্ধ দর্শনে দেশিত প্রজ্ঞার দৃষ্টিতে জীবন জগতের সবকিছু প্রকৃতপক্ষে অসম্পূর্ণ(চরম এবং চুড়ান্ত নয়), অনিত্য বা অস্থায়ী(সদা পরিবর্তনশীল) এবং অনাত্ম(আত্ম বিহীন) অর্থা নিজ বলতে কিছুই নেই, যেহেতু প্রতিমুহুর্তে নিজ অবিরাম পরিবর্তনের আয়ত্তাধীন। তবে বুদ্ধ সবার কাছে প্রজ্ঞার কথা বলতেন না। কারণ প্রজ্ঞার অর্থ হৃদয়াঙ্গম করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রজ্ঞা হলো নিজে প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করে হৃদয়াঙ্গম করা। প্রজ্ঞার বিধান হলো চারিপাশের সবকিছু স্থান, কাল বিশেষে বিশ্লেষন করে খোলা মনে সবকিছুর সত্যতা মূল্যায়ন করা। নিজের বদ্ধমূল মতামত নিয়ে আবদ্ধ থাকা নয়, অন্যের মতামত ধৈয্যের সঙ্গে শোনা ও পরীক্ষা করা। প্রজ্ঞা বলতে বোঝায় প্রচলিত সংষ্কারে নিবদ্ধ না থেকে সম্যক দৃষ্টিতে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে নিজের অভিমত স্থির করা। যথার্থ প্রমাণ ও যুক্তির আলোকে যে কোন সময় নিজের মতামত পরিবর্তন করতে প্রস্তুত থাকা। যিনি অনুরূপভাবে আচরণ করেন, তিনিই প্রজ্ঞাবান। শোনা কথা বা প্রচলিত সংষ্কারে বিশ্বাস করা সহজ। বুদ্ধ নির্দেশিত প্রজ্ঞার পথে চলতে হলে প্রয়োজন হয় সসাহস, ধৈয্য, নমনীয়তা ও বুদ্ধিমত্তা। বৌদ্ধ দর্শনের এই সব গুণাবলী হলো প্রজ্ঞার মর্মবাণী।
প্রশ্নঃ- মনে হয় বৌদ্ধ দর্শন সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য নয়। এইক্ষেত্রে দর্শনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
উত্তরঃ একথা সত্য বৌদ্ধ দর্শনের সকল বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য নয়, তাই বলে এর প্রয়োজনীয়তা নেই একথা বলা যায় না। জীবন জগতের কঠোর, কঠিন সত্য বুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতায় উন্মোচিত হয়েছে যা বৌদ্ধদর্শনে বিধৃত। এখন কেউ তা বুঝতে না পারলে, ভবিষ্যত কর্মপ্রচেষ্টায় তা পারবেন। এই কারণে বৌদ্ধরা ধৈর্য সহকারে নিরবে নিভৃতে বৌদ্ধ দর্শন বিষয়কে উপলদ্ধি করতে সচেষ্ট হন। ধ্যন অভ্যাস এজন্য অবশ্য করণীয়। বুদ্ধ করুণা পরবশঃ হয়ে মানষের দুঃখমুক্তির জন্য তাঁর সাধনালব্দ সত্য মানুষের কাছে প্রচার করেছিলেন। আমরাও সেই উদ্দেশ্যে তা প্রচার করি।
প্রশ্নঃ- এবার বলুন করুণা কি?
উত্তরঃ প্রজ্ঞা যেমন আমাদের স্বভাব-চরিত্রের বৃদ্ধি ও মেধার দিক নির্দেশ করে, করুণা অনুরূপভাবে আমাদের স্বভাব-চরিত্রের কোমল অনুভূতির দিকটি নির্দেশ করে। প্রজ্ঞার মতো করুণা একটি অপরূপ মানবিক গুণ। করুণার ভাবার্থ ইংরেজী compassion শব্দের co এবং passion দিয়ে বুঝানো যেতে পারে। co অর্থ সমবায় বা সম্মিলিত এবং passion অর্থ সহমর্মিতা বা সহানুভূতি। অর্থা করুণা বলতে কারও অবস্থা(দুঃখ-কষ্ট)কে সহানুভূতির সঙ্গে উপলদ্ধি এবং অপরের দুঃখ-কষ্ট উপশম করার সচেতন প্রচেষ্টা বুঝায়। একজন করুণাসিক্ত ব্যক্তি নিজের প্রতি যে ভালবাসা পোষণ করেন, সেই ভালোবাসাতেই অন্যের দুঃখ অনুভব করেন। নিজেকে সঠিকভাবে বুঝতে পারলেই অপরকে বুঝা সম্ভব। নিজের জন্য যা উত্তম অন্যের জন্যেও তা উত্তম মনে করেন। নিজের প্রতি সহমর্মী হবার পর অন্যের প্রতি সহমর্মী হওয়া সম্ভব হয়। বৌদ্ধিক জীবনাচরণে নিজের স্বরুপ সম্পর্কে জ্ঞাত হলে অন্যের মঙ্গল কামনা অনুভূত হয়। কারণ জগতে জীবনের স্বরুপ এমন, সেখানে সবার প্রতি করুণা ছাড়া নিজের প্রকৃত সুখ-শান্তি পাওয়া যায় না। বুদ্ধের জীবনাচরণে এই সত্যটি মহিমান্বিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি  তাঁর দীর্ঘ ৬ বছরব্যাপী কঠোর সাধনালব্দ জ্ঞান, মানুষের প্রতি করুণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রচার করেছিলেন।
প্রশ্নঃ- আপনি বলেছেন নিজের কল্যাণ করার পর অন্যের কল্যাণ করা সম্ভব। এটি কি স্বার্থপরতা নয়?
উত্তরঃ সাধারণত স্বার্থপরতা  বলতে নিজের কল্যাণে এবং নিঃস্বার্থপরতা বলতে অন্যের কল্যাণে কর্মসম্পাদন বুঝায়। এর কোনটিকে বৌদ্ধদর্শনে ঐরূপ আলাদাভাবে না দেখে দুটিকে একীভূত করে দেখা হয়।  এতে জ্ঞানের আলোকে জ্ঞাত স্বার্থ চিন্তা ক্রমশঃ স্বার্থপরতা থেকে অন্যের স্বার্থ চিন্তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আবির্ভূত হয়। সহমর্মীতা দিয়ে মা তাঁর একমাত্র সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন, সেইরূপ সহমর্মীতায় সকল জীবের প্রতি মঙ্গল কামনা হলো করুণা। বৌদ্ধিক গুণাবলী খচিত মুকুটে করুণা একটি অমূল্য রত্নের মতো শোভা পায়।
[***যথাশীঘ্র কুশলকর্ম সম্পাদনে উদ্যোগী হও। নিজের মন অকুশল কর্মে লিপ্ত কিনা পয্যবেক্ষণ করো। কুশলকর্ম সম্পাদনে বিলম্ব হলে মন অকুশলকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে।]
........................................................................................................................

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন