অগ্রমৈত্রী বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র

অগ্রমৈত্রী বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রটি খাগড়াছড়ি জেলা সদরের মধ্যে তেতুলতলা এলাকায় অবস্থিত। ভাবনা কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেন বিদর্শনাচার্য্য ্রীমৎ তেজবংশ স্থবিরভাবনা কেন্দ্রটি প্রায় দুই একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। এখানে বিদর্শন ভাবনা প্রশিক্ষণ দেয়া হয় অত্যন্ত যত্ন সহকারে। ভাবনা কেন্দ্রটির অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় তেজবংশ স্থবির স্বয়ং বিদর্শন ভাবনা প্রশিক্ষণের তদারকি করেন। 
প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের দিকে ভাবনা কোর্স শুরু হয়। বিদর্শন ভাবনা কোর্স একটানা দশদিন। এসময় সাংসারিক সকল কাজ কর্ম ফেলে রেখে ভাবনায় অংশ গ্রহণকারীগণ ভাবনায় নিবিষ্ট হন। ভাবনা চলাকালীন দিনগুলোতে মোবাইল ব্যবহার, বইপড়া, আলাপ-চারিতা একদম বন্ধ। পুরো দশদিন মৌনব্রত পালন করে ভাবনায় মনোনিবেশ করতে হয়।
ভাবনাকারীগণের থাকার ব্যবস্থা ভাবনা কেন্দ্রের ভিতরে। মহিলা ভাবনাকারীদের জন্য আলাদা থাকা, গোছল এবং  টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে। ভাবনা পরিচালনার জন্য একটি কমিটি করা হয়।
কিভাবে যাবেন: 
ঢাকা হতে - ঢাকা হতে  সরাসরি চেয়ার কোচে খাগড়াছড়ি নামবেন। ঢাকা কলাবাগান অথবা সায়েদাবাদ স্টেশন হতে শ্যামলী, এস আলম, ষ্টার লাইন ইত্যাদি বাসে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম হতে- চট্টগ্রামের আক্সিজেন স্টেশন হতে শান্তি স্পেশাল বিরতিহীনে চড়ে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়।
খাগড়াছড়ি বাজারে নেমে ইজি বাইকে চড়ে মধুপুর বাজার যাবেন। সেখান থেকে আবার ইজি বাইকে চড়ে তেতুল তলা অগমৈত্রী ভাবনা কেন্দ্রে যাবেন।

বিদর্শন ভাবনা অনুশাসন সহায়িকা

প্রস্তাবনা: পালি "বিপস্সনা" শব্দ থেকে বিদর্শন শব্দটি এসেছে। বিপস্সনা ভারতবর্ষের বহু প্রাচীন সাধনা পদ্ধতি। এ পদ্ধতি আড়াই হাজার বছর পূর্বে ভগবান গৌতম বুদ্ধ আবিষ্কার করেন।তিনি নিজেই এই পদ্ধতি অনূশীলন করে জ্ঞানের সবোর্চ্চ শিখরে উপনীত হয়েছেন এবং তা সর্বসাধারণের হিতার্থে প্রচার করে গেছেন। বিদর্শন শব্দের অর্থ বিশেষভাবে দর্শন, আত্ম নিরীক্ষণ বা আত্মসমীক্ষণ বুঝায়। ভাবনার গভীরে প্রবেশ করে কায় ও মনের অনুক্ষণ পরিবর্তনশীল অনুভূতিকে নির্লিপ্তচিত্তে দর্শন করাই বিদর্শন।

বিদর্শন ভাবনার উদ্দেশ্য: প্রত্যেক মানুষ রাগ-দ্বেষ-মোহ নামক অন্তর মালিন্যতার অধীন। যে মালিন্যতার কারণে মানুষ নিজেকে যেমন পাপ কার্যের দিকে নিয়ে যায় তেমনি অপরকেও। বিদর্শন ভাবনা হচ্ছে মনের এ সব ক্লেশ বা লোভ-হিংসা-ক্রুরতা ইত্যাদি হতে মুক্তি লাভ করা। রাগ-দ্বেষ-মোহের জটায় জটিত চিত্ত বিদর্শন ভাবনা দ্বারা নির্মল করা যায়। এছাড়াও এর মাধ্যমে শরীর এবং মনের নানাবিধ রোগ নিরাময় হয়। তবে মনে রাখতে হবে যে বিদর্শন ভাবনার উদ্দেশ্য রোগ নিরাময় নয়, বরং পারমার্থিক উন্নতি।

অনুশাসন: বিদর্শন ভাবনা কোর্স মোট দশদিন চলে। যিনি ভাবনা শিবিরে যোগ দেবেন তাকে টানা দশদিন থাকতে হবে। মাঝপথে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ম বিরুদ্ধ। বিদর্শন সাধনা আয়ত্ব করার ক্ষেত্রে এ ক'দিন সময় খুবই কম। তাই সময়ের সদ্ব্যবহার নিতান্ত আবশ্যক। সাধনার সুফল লাভে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে যথা নিয়ম প্রতিপালন পূর্বক নিরন্তর একান্ত মনে সাধনা করে যাওয়া বিশেষ প্রয়োজন। ভাবনা কোর্সের দৈনন্দিন সময়সূচী বা নিয়মাবলী বহু সাধকের অনূভুতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিজ্ঞান সম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই অনুশাসন সহায়িকায় প্রদত্ত নিয়ম-কানুন আগে মন দিয়ে পড়ে নিয়ে সেসব নিষ্ঠা সহকারে  পালন করতে প্রস্তুত থাকলে তবেই ভাবনা কোসে আবেদন করা উচিত।

নানাবিধ পূজা সাধনা বিধির সংমিশ্রণ: বুদ্ধপূজা, সীবলীপূজা, অর্হত পূজা, উপগুপ্ত পূজা, ধূপ, দীপ পূজা, গাথা পাঠ, জপ-তপ, ভজন-কীর্তন, সবকিছু ভাবনায় যোগ দেওয়ার সাথে সাথে ভাবনা কোর্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে। যদি বিদর্শন ভাবনার সাথে অন্য বিধির সংমিশ্রণ ঘটে তবে আসল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যাবে।

ভেতর বাহির সম্র্ক: ভাবনা কোর্সের মধ্যে সাধক-সাধিকাকে পুরো দশদিন কেন্দ্রের সীমানার ভিতরে থাকতে হবে। এ দশদিনের মধ্যে কোন রকম আলাপ-ফোনালাপ বা পত্রালাপ করা যাবে না। ভাবনাকারীর কোন আত্মীয় বা অভিভাবক কোন প্রয়োজনে কেন্দ্রে আসলে তাকে ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দেখা করতে হবে, সাধক-সাধিকার সঙ্গে নয়। 

অসুখ-বিসুখ: ভাবনা করাকালীন মাথা ধরা, বমি ভাব, প্রচন্ড ব্যথা, শারিরীক-মানসিক অশান্তি ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারেএ  সময কোন রকম ঔষধ সেবন নিয়ম বিরুদ্ধ। কারোর কোন রোগ ব্যাধি থাকলে তা ভাবনা কোর্সের প্রথম দিনে ভাবনা করার আগে আচার্যকে অবহিত করতে হবে।

আবাসন: স্ত্রী-পুরুষ একসাথে থাকা নিয়মবিরুদ্ধ। আহার, বিহার, সাধন-শয়ন যে কোন সময় কোন রকম যোগাযোগ অবিধেয়। এমনকি ইশারা-ঈঙ্গিতেও।

মৌনতাবলম্বন: ভাবনা শুরুর প্রথম দিন থেকে দশম দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত মৌন থাকতে হবে। অর্থাৎ মৌখিক বা লিখিত বাক্যালাপ এমনকি ইশারা-ঈঙ্গিতেও ভাব বিনিময় করা যাবেনা। অত্যন্ত জরুরী কোন প্রয়োজন হলে ব্যবস্থাপককে স্বল্প কথায় জানাতে পারবেন। তবে তা অন্যান্য সাধক-সাধিকার ক্ষতি না হয় মত উচ্চস্বরে যেন না হয়। ভাবনা সম্পর্কিত কোন প্রশ্ন থাকলে যথা সময়ে তা জিজ্ঞাসা করবেন। ভাবনায় সাফল্য নির্ভর করবে প্রত্যক ব্যক্তির নিজস্ব প্রয়াসের উপর, অতএব বহুজনের মাঝে থেকেও  একাকী, আত্মস্থ হয়ে নিয়ম অনুসরণ করাই বিধেয়।  

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: দৈনিক একবার স্নানই একজন ভাবনাকারীর জন্য যথেষ্ট। দেহের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি নিজের ব্যবহার্য রুম, স্নানঘর, টয়লেট সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে। বেশ-ভূষার ক্ষেত্রে দেহের শুচিতা, পোষাকের শালিনতা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে, মেয়েদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ(জাল বিশেষ), ফিনফিনে পাতলা বস্ত্র পরিত্যাজ্য। সালোয়ার কামিজের সঙ্গে দোপাট্টা রাখা বিধেয়।

আহার: ভাবনা কোর্সে দৈনিক দুবেলা আহার দুবেলা পানীয় ভাবনাকারীদের জন্য পরিবেশন করা হয়। সকাল ৬টায় যাগু, দুপুর ১১টায় ভাত, বিকাল ৪টায় এবং রাত ৮টায় পানীয় ব্যবস্থা থাকে। কোন রুগ্ন সাধকের চিকিৎসকের পরামর্শে অন্যকিছু পথ্যের প্রয়োজন হলে তা আবেদনপত্রে উল্লেখ করবেন অথবা ব্যবস্থাপককে জানাবেন, পরবর্তীতে তা ব্যবস্থা করা হবে কিনা কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবে। 

অন্যান্য প্রতিপাল্য বিধি:

*মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, রেডিও, টিভি ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না । ঐসব জিনিস কেন্দ্রে আনলে তা দশ দিসের জন্য অফিসে জমা দিতে হবে।

*যে কোন ধরনের বই, সংবাদপত্র পড়া এবং লেখলেখি দশদিনের জন্য বন্ধ রাখতে হবে।

*যে কোন অলংকারপাতি বা দামী জিনিস ভাবনা শিবিরে না আনাই ভাল। আনলেও তা অফিসে জমা দিতে হবে।

*পান, বিড়ি, সিগারেট,জর্দা, নস্যি ইত্যাদি নেশাদ্রব্য শিবিরে আনা ও ব্যবহার করা অবিধেয়।

*ভাবনা কোর্সে আসার সময নিজের ব্যবহার্য্য জিনিস- ব্রাশ, টুথ পেস্ট, টর্চলাইট, লেপ, তোষক ইত্যাদি সঙ্গে আনতে হবে। মশারি বালিশ কেন্দ্র হতে সরবরাহ করা যাবে।

*বিদেশী সাধক/সাধিকা পাসপোর্ট ভিসা সঙ্গে আনবেন।

*কোন ঘড়ি ব্যবহার অবিধেয়।

আচার্যের সাক্ষাতকার: ভাবনা বিষয়ে বা অন্য কোন বিষয়ে সমস্যা দেখা দিলে চংক্রমনের সময় আচার্যকে বলা যাবে এবং রাত্রে ১০.০০টা হতে ১০.৩০টা পর্যন্ত উদ্ভুত সমস্যা সমাধানের নির্ধারিত সময়ে বলা যাবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আলোচনা তা কোন তাত্ত্বিক বা দার্শনিক বিষয় চর্চার জন্য নয়, কেবল ভাবনার সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনা। ভাবনা কোর্স শেষে তুলনামূলক চর্চা করার অবকাশ যথেষ্ট পাবেন।

শীল পালন: বিদর্শন সাধনায় আত্মনিয়োগ করার আগে প্রত্যক উপাসক-উপাসিকাকে অষ্টশীল পালন করতে হবে। অষ্টশীল হচ্ছে আটটি নিয়ম। যথা-

১.প্রাণীহত্যা না করা।

২.চুরি নাকরা।

৩.অব্রহ্মচর্য আচরন না করা।

৪.মিথ্যা কথা না বলা।

৫.নেশা সেবন না করা

৬.দ্বিপ্রহরের পর আহার না করা।

৭.নাচ  ও গান বাজনা  না করা এবং নানাবিধ অলংকার , প্রসাধনী ব্যবহার না করা।

৮.বিলাসী শয্যা ব্যবহার না করা।

*ভিক্ষু বা শ্রমণ হলে যে কোন ধরণের টাকা-পয়সা বা স্বর্ণ রৌপ্য গ্রহণ না করা এতে সংযুক্ত।

*ভিক্ষু হলে তাকে অবশ্যই আপত্তি দেশনা করতে হবে এবং পাতিমোক্ষ শীলে প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে।

আচার-আচরণ: প্রত্যেকের আচার আচরণ ভাল হওয়া চাই। নিজের চলাফেরায় যাতে অন্যের ক্ষতি না হয় সেদিকে র্বদা খেয়াল রাখতে হবে। কেউ কারোর সাথে ঝগড়া বিবাদ করতে পারবেন না।কারোর গর্হিত আচরণে উত্তেজিত হবেন না, নিজেকে বশে রেখে একান্ত মনে ধ্যান চালিয়ে যাবেন।

ব্যয় সংক্রান্ত কথা: ভাবনা কোর্স পরিচালনার ব্যয় ভাবনাকারী  এবং দায়কদায়িকাদের  স্বেচ্ছাদানের উপর নির্ভর করে। ভাবনা কোর্স সমাপ্ত হলে আপনারাও পরবর্তী ভাবনা কোর্স পরিচালনার সহায়তার জন্য সাধ্যমত দান করে যেতে পারেন। আপনাদের নি:স্বার্থ দান কেন্দ্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ব্যয় হয়ে থাকে।

শেষকথা: পূর্বেই বলা হয়েছে বিদর্শন ভাবনার মূল উদ্দেশ্য পারমার্থিক উন্নতি বা আধ্যাত্মিক বিকাশ। যে কোন জন নাম-যশ-খ্যাতি লাভের আশায় দান করা বা ভাবনা করা উচিত নয়। প্রকৃত ভাবনাকারী পরিবারের ও সমাজের সুখী সদস্য হিসেবে বসবাস করতে পারবেন এবং নি:স্বার্থ দাতা ত্যাগের মাঝে বিপুল সুখ লাভ করতে পারবেন। অগ্রমৈত্রী বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আপনাকে সহায়তা করতে আমরা সদা প্রস্তুত।

আপনার সাধনার সাফল্য  কামনা করছি।

যোগাযোগ:

ময়মন চাকমা

মেবাইল-০১৫৫৩৭৯০৫৭৯, ০১৮২৬৫৯৪১০৫.

 

ভাবনায় ফল লাভের উপায়

চিত্তের একাগ্রতা আনার এবং জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে ভাবনা, ভাবনা ছাড়া চিত্তের একাগ্রতা আসে না এবং একাগ্রতা ছাড়া বিদর্শন লাভ হয় না। লৌকিক ও লৌকত্তর হিসেবে ভাবনাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথাঃ
১। শমথ ভাবনা(লৌকিয় সাধনা)
২। বিদর্শন ভাবনা (লোকত্তর সাধনা)
শমথ ভাবনার দ্বারা ক্লেশ উপশম হয় ও চিত্তের একাগ্রতা আসে এবং বিদর্শন ভাবনার দ্বারা অজ্ঞান ধ্বংস হয় এবং ক্লেশ নিবৃতি ঘটে। ভাবনা করতে হলে ভাবনাকারীর প্রাথমিক কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে প্রয়োজনঃ-
ভাবনাকারীকে নিজের চরিত্র অনুযায়ী উপযুক্ত গুরুর কাছ থেকে ভাবনার বিষয় ভালভাবে জেনে নিতে হবে। বিষয় নির্বাচিত হয়ে গেলে সে বিষয়ের উপর শিক্ষা, অভ্যাস, আচরণ ধারণ ও পুরণ করার জন্য দৃঢ়তার সাথে চেষ্টা করতে হবে। ভাবনার সময় অন্য সকল চিন্তা মন থেকে দূরীভূত করে সে বিষয়ের উপর মনকে ডুবে রাখার জন্য বারংবার চেষ্টা করতে হবে। যে বিষয়ের উপর ভাবনা করা হয় সেই বিষয় বাদে যদি অন্য বিষয় নিয়ে মন ডুবে থাকে তাহলে বুঝতে হবে প্রকৃত ভাবনা হচ্ছে না। নিম্নে শ্রদ্ধেয় বনভান্তের ভাবনা বিষয়ক দেশনা এবং ধর্ম্মীয় শাস্ত্রের বিভিন্ন উপদেশ হতে শমথ ভাবনা ও বিদর্শন ভাবনার কয়েকটি বিষয় সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো।

শমথ ভাবনাঃ
১। কামাসক্তি পরিত্যাগের জন্য ৩২ প্রকার অশুচি ভাবনা করা। এ ভাবনার দ্বারা নাম-রূপের(কায়ের) প্রতি লোভ উপশম হয়।
২। ক্রোধ হিংসা পরত্যাগের জন্য চারি ব্রহ্মবিহার ভাবনা করা।
ক) মৈত্রী ভাবনা-বিশ্বের সকল প্রাণীর সুখ কামনা করা।
খ) করুণা ভাবনা- বিশ্বের সকল প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করা।
গ) মুদিতা ভাবনা- অপরের সুখ, সৌভাগ্য দর্শনে সুখ অনুভব করা তথা মঙ্গল কামনা করা।
ঘ) উপেক্ষা ভাবনা- শত্রুর প্রতি হিংসা না করার ভাবনা।
৩। চিত্তের বিতর্ক পরিত্যাগের জন্য আনাপান স্মৃতি বা শ্বাস-প্রশ্বাস ভাবনা করা। বিতর্ক তিন প্রকারঃ
ক) কাম বিতর্ক-পুরূষ যদি নারীর অথবা নারী যদি পুরুষের রূপ লাবণ্যে ও স্পর্শে সুখকামনা উদ্রেক করে তা চিত্তের কাম প্রবৃত্তি।
খ) হিংসা বিতর্ক- শত্রুকে মারার, হত্যা করার প্রবৃ্ত্তি।
গ) রাগ বিতর্ক- তাকে কষ্ট দিব, দুঃখ দিব ইত্যাদি চিন্তা।
৪। আমিত্ব বা অহংকারাদি পরিত্যাগের জন্য পঞ্চস্কন্ধের (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংষ্কার, বিজ্ঞানস্কন্ধ) অনিত্য ভাবনা করা। অহরহ ক্ষয় হচ্ছে বলে অনিত্য।


আত্মা ও অনাত্মাবাদ

লেখক: বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির
বইয়ের নাম: সত্য দর্শন
আমরা বলি, আমার শরীর, আমার জ্ঞান-ধ্যান, আমি সুখ-দু:খ অনুভব করি, আমি দেখি-শুনি, আমার দ্বারা ঘ্রাণন-স্বাদন-দর্শন-স্পর্শন কারয্য সমাপাদিত হয়। চিরাগত প্রশ্ন হইতেছে,- এই শরীরের অধিকারী কে? এই যে তথাকথিত আমি সে কে?

প্রাচীন কাল হইতেই দার্শনিকগণ এই সব প্রশ্নের বিচার করিয়া আসিতেছেন, এই আমি কে?প্রশ্ন খুব সহজ, উত্তরও সরল বলিয়াই আমাদের ধারণা। আমরা মনেকরি আমার শরীর, আমার চক্ষু-কর্ণাদি বলিতে এখানে না বুঝিবার কি আছে? কিন্তু আসলে তাহা নহে। প্রশ্নটি স্বভাব-গম্ভীর। এইজন্য দার্শনিকগণ বিভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন ও ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিয়াছেন।

কেহ কেহ বলেন-  ব্যক্তির পশ্চাতে এমন এক সত্তা আছে, যিনি শরীরের কর্ত্তা, জ্ঞানের জ্ঞাতা, সুখ-দু:খের ভোক্তা, দ্রষ্টা, ঘ্রাতা, স্বাদেতা, স্পর্শেতা, ইনিই হইতেছেন আমাদের আত্মা। কেহ বলিয়াছেন পুরুষ, কেহ বলিয়াছেন জীব। কিন্তু এই শ্রেণীর ভিন্নতায় কিছু আসিয়া যায় না। সকলে একটি কিছু লক্ষ্য করিয়াছেন, ইহা একান্ত সত্য। এই আত্মাই শরীর ও মনের পরিচালক। জানন, ভোজন, দর্শন, স্পর্শন,ধারণ গমনাদি জ্ঞান ও কর্ম্মেন্দ্রিয় গ্রামের সাহায্যেই তিনি সম্পাদন করিয়া থাকেন। আত্মা, মন ও শরীরের পরে।মন ও শরীরের তিনি একমাত্র কর্ত্তা ও সর্বেসব্বা।

এই মতবাদে আজও পৃথিবীর বহু বিজ্ঞাবিজ্ঞ লোক প্রতিষ্ঠিত। তথাগত  বুদ্ধ্বই সর্ব্ব প্রথম এই মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অনাত্মাবাদী, সন্ততিবাদী। একদা পৃথিবী এই অনাত্মবাদকে শ্রদ্ধাবনত মস্তকে গ্রহণ করিয়াছিল। আজও অনাত্মবাদীর সংখ্যা তুল্য তুল্য বলিতে হইবে।

জাতিস্মর জ্ঞান ও সংক্রমণ স্বীকার না করিয়া আপাতত: কিরূপে পারা যায়? কিন্তু আত্মার(বিজ্ঞানের) ভিন্ন দেহ সংক্রান্তি অস্বীকার করিয়া তথাগত সাতি নামক ভিক্ষুকে তিরষ্কার করিয়াছিলেন। তাঁহার মত এই য়ে,- বিজ্ঞান তথাকথিত আত্মা ও প্রতীত্য সমুতপন্ন ধর্ম্ম। প্রত্যয় ভিন্ন বিজ্ঞানের  উতপত্তি অসম্ভব। বহু জলানুর স্রোতরূপে প্রবাহমান সন্ততিকে যেমন আমরা নদী বলি, বহু বিজ্ঞানের সন্ততিকে তেমনই আত্মারূপে সাধারণভাবে আমরা গ্রহণ করিয়াছি। জলানুর স্রোতই সত্য, নদী ব্যবহার মাত্র। আত্মাও ব্যবহার মাত্র, বিজ্ঞান সন্ততিই সত্য। যাজ্ঞবল্ক্য আত্মাকে ইহ পর জন্মের সেতু রূপে বর্ণনা করিয়াছেন, কিন্তু তথাগত কর্ম্মকেই সেতুরূপে স্থাপন করিয়াছেন। দীপ্ত দীপ হইতে, অন্য অদীপ্ত দীপ দীপ্ত করিলে যেমন পূর্ব্ব দীপ্তির সংক্রমন হয় না, অথবা গুরু হইতে ছাত্র মন্ত্র শিক্ষা করিলে, যেমন গুরু মন্ত্রহীন হন না, তদ্রুপ আত্মার (বিজ্ঞানের) সংক্রান্তি না হইলেও সংষ্কার-প্রত্যয় লাভে, পরজন্মে উহার অস্তিত্বের বিকাশ হয়। সে আত্মা (বিজ্ঞান) সেও নহে, পূর্ব্ব বিজ্ঞানকেই (আত্মাকেই) অবলম্বন করিয়া  পর বিজ্ঞান সম্ভব হইয়াছে।
বেদান্ত দর্শনে কারণ শরীরের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই কারণ শরীর যদি ভবাঙ্গ চিত্তই হয়, তবে বিশেষ গোলে পড়িতে হয় না। ভবাঙ্গ অন্যান্য চিত্তের ন্যায় সক্রিয় নহে। ইহা অতি সুক্ষ্ম স্পর্শ-বেদনা-সংজ্ঞা-চেতনা-একাগ্রতা-মনষ্কার জীবেতেন্দ্রিয় ও অন্যান্য চৈতসিক সম্পর্কিত। ভবাঙ্গের একমাত্র প্রকাশ সুসুপ্তি। সমুদয় চিত্ত মহুর্মুহু উতপন্ন হইয়া বিলয় প্রাপ্ত হইতেছে।প্রতি চিত্তই কিন্তু অভিনব। কিন্তু ভবাঙ্গ জন্ম হইতে মৃত্যু পযর্ন্ত প্রতিচিত্ত বীথির আদিতে ও অন্তে সমুদিত হইয়া চিত্তোতপত্তির অবকাশ প্রদান করিয়া থাকে; কিন্তু সে স্বয়ং পুরাতন সদৃশ, অভিনবত্ব তাহার নাই। পুনর্জন্মেই সে অভিনব হয়, জীবের কৃতকর্ম্মানুসারে। যদি এই কারণ শরীর , কর্ম্ম-কারণ জাতীয় হয় তবে বৈদান্তিক আত্মা বৌদ্ধ বিজ্ঞান সন্ততির রূপ ধারণ করে এবং উভয় জাতীয় আত্মার কোন ভেদ থাকে না। ব্রহ্মবাদেও না। ভেদ থাকিয়া যায় মুক্তি বিমুক্তির মধ্যে। বেদান্তে ব্রহ্ম বৈলিন্যই মুক্তি, এরূপ সিদ্ধান্ত করা হইয়াছে। তথাগত উহা সায়ুক, সসীম মুক্তি মাত্র বলিয়া, বিজ্ঞান সন্ততির প্রবাহ ছিন্নকেই বিমুক্তিরূপে দেখাইয়াছেন। সইচ বিকল হইলে যেমন বিজলী ধারা রুদ্ধ হয় এবং তত্ সঙ্গেই বাতি নিভিয়া যায়, এইরূপ বিজ্ঞান সন্ততি বিকল হইয়া গেলে তৃঞ্চাধারাও রুদ্ধ হইয়া যায়। তৃঞ্চার নিরোধে আত্মারূপ জীবনদীপ চিরতরে নিবৃত্ত হয়।
তথাগত বুদ্ধ কিরূপে বহুজনে প্রতিষ্ঠিত আত্মবাদ খন্ডন করিয়াছিলেন, মহাপন্ডিত গ্রীকরাজ মিলিন্দের প্রশ্নে ও বিচিত্রবাদী মহাভিজ্ঞ স্থবির নাগসেনের উত্তরে, স্পষ্টানুভূতি পাওয়া যাইবে। চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ সাধারণত: ঈশ্বর-অনীশ্বর আত্মা-অনাত্মা বিষয়েই প্রথমে চিন্তা করিয়া থাকেন। ইহা যেন একান্ত স্বাভাবিক। মহারাজ মিলিন্দও প্রথমে প্রশ্নে উহাই গ্রহণ করিয়াছিলেন:-
মিলিন্দ- ভন্তে! আপনি কিরূপে জ্ঞাত হইয়া থাকেন? আপনার নাম কি?
নাগসেন- মহারাজ! আমি নাগসেন বলিয়া জ্ঞাত, নাগসেন কিন্তু সংজ্ঞা প্রকাশ ব্যবহার ও নাম মাত্র, এখানে কোন ব্যক্তি বা অবযবী উপলদ্ধি হয় না।
মিলিন্দ- যদি ভন্তে ব্যক্তি না থাকে, তবে কে আপনাকে চীবরাদি ও চতুষ্টয় দান করে, কে উপভোগ করে, কে ভাবনা অভ্যাস করে, কে মাগর্ফল প্রত্যক্ষ করে,কে প্র্রাণী হত্যাদি পঞ্চ অকুশল কর্ম সম্পাদন করে? তাহা হইলে কুশল নাই, অকুশল নাই, কুশলাকুশলের কর্ত্তা নাই, কারয়িতা নাই, সুকৃত-দুষ্কৃত কর্মের ফলও নাই।আপনাকে যদি কেহ হত্যা করে তাহা হইলেও হত্যাকারীর কোন পাপ হইবে না। আপনার আচায্য নাই, উপাধ্যায় নাই, উপসম্পদাও নাই। আপনি যাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন যে মহারাজ! আমি নাগসেন বলিয়া জ্ঞাত। এখানে সেই নাগসেন কে? ভদন্ত! কেশগুলি কি নাগসেন?
নাগসেন- না মহারাজ।
মিলিন্দ- লোম, নখ, দন্ত, ত্বক, মাংস নাগসেন?
নাগসেন- না মহারাজ।
মিলিন্দ- রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংষ্কার, বিজ্ঞান নাগসেন?
নাগসেন- না, না, না মহারাজ।
মিলিন্দ- তবে কি ভন্তে! রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংষ্কার, বিজ্ঞান এই পঞ্চস্কন্ধের সমষ্টিরূপে নাগসেন?
নগসেন- না, মহারাজ।
মিলিন্দ- ভদন্ত! আপনাকে জিজ্ঞাসা করিয়া করিয়া নগসেনকে পাইলাম না। নাগসেন কি তবে শুধু শব্দই? বিদ্যমান নাগসেন কে তবে? আপনি মিথ্যা বলিয়াছেন, নাগসেন নাই।
নাগসেন- মহারাজ, আপনি ক্ষত্রিয়-কুমার, সুকোমল শরীর আপনার, মধ্যাহ্ন সময় এখন, ভূমি তপ্ত, উঞ্চ বালুকার উপর তীক্ষ্ম কাঁকর, ভগ্ন মৃপাত্র সমূহ মর্দন করিয়া পদব্রজে আসায় সম্ভবত: আপনার চরণ উপহত হইয়াছে, শরীরও বোধহয় ক্লান্ত হইয়াছে?
মিলিন্দ- আমি রথে করিয়া আসিয়াছি ভন্তে, আমার বিন্দুমাত্র ক্লান্তি হয় নাই।
নাগসেন- মহারাজ আপনি যদি রথে আসিয়া থাকেন, তবে রথ কি তা আমাকে বলুন। ঈশা কি রথ?
মিলিন্দ- না ভদন্ত।
নাগসেন- অক্ষ, চক্র, পঞ্জর, দন্ড, রজ্জু, প্রতোদ দন্ড কি রথ?
মিলিন্দ-না,না,না ...ভদন্ত।
নাগসেন-তবে কি মহারাজ ঐগুলির সমষ্টিরূপে রথ?
মিলিন্দ-না ভদন্ত।
নাগসেন- আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিয়া করিয়া হয়রাণ হইলাম, অথচ রথ দেখিতে পাইতেছি না। মহারাজ, রথ কি তবে কেবল শব্দমাত্র? তবে এখানে বিদ্যমান রথ কি?আপনি মিথ্যা বলিয়াছেন, এখানে রথ নাই।
মিলিন্দ- ভদন্ত! আমি মিথ্যা বলি নাই। ঈশা চক্রাদির সমবায়ে সুসংবদ্ধতা হেতু রথ। ইহা সংজ্ঞা প্রকাশ, ব্যবস্থারও নাম মাত্র।
নাগসেন- সাধু, সাধু, মহারাজ রথ কি তাহা আপনি ভাল জানেন। ঠিক এইরূপই মহারাজ! কেশ-লোমাদি রূপ এবং বেদনা-সংজ্ঞা-সংষ্কার-বিজ্ঞান এই পঞ্চস্কন্ধ হেতুই নাগসেন। এইগুলিকে আশ্রয় করিয়াই নাগসেন সংজ্ঞা, ব্যবহার, প্রকাশ ও নাম মাত্র প্রবর্ত্তিত হইতেছে। পরমাথর্ত: এখানে পৃথক কোন ব্যক্তি বা অবয়বীস্বরূপ লোকের বা আত্মার উপলদ্ধি হয় না।
মিলিন্দ- সাধু, সাধু, ভন্তে নাগসেন, অতি সুন্দর ও বিচিত্র রূপে আপনি  উত্তর প্রদান করিয়াছেন।
মন্ত্রী অনন্তকায়ের প্রশ্ন
অনন্তকায়- ভদন্ত নাগসেন! এই যাহাকে আমি নাগসেন বলিতেছি, সেই নাগসেন এখানে কে?
নাগসেন- আপনি কাহাকে নাগসেন মনে করেন?
অনন্তকায়- আমি মনেকরি যে, সেই অভ্যন্তরস্থ বায়ুই নাগসেন; যাহা প্রবেশ করিতেছে আর নিষ্ক্রান্ত হইতেছে।
নাগসেন- যদি এই বায়ু নিষ্ক্রান্ত হইয়া আর প্রবেশ না করে, অথবা প্রবেশ করিয়া আর নিষ্ক্রান্ত না হয়, তবে কি সেই পুরুষ জীবিত থাকিবে?
অনন্তকায়- না ভদন্ত।
নাগসেন- এই য়ে শঙ্ক বাদকেরা শঙ্ক বাদন করে, সেই বায়ু কি তাহাদের মধ্যে পুনরবার প্রবেশ করে?
অনন্তকায়- না ভদন্ত।
নাগসেন-তাহা হইলে শঙ্ক বাদকেরা মরে না কেন?
অনন্তকায়- আপনি বাদী, বিচারশীল, আপনার সহিত আলাপ করিতে আমি অসমর্থ।
ভাল ভদন্ত, এখানে তত্ত্ব কথা কি তাহা আপনি আমাকে বলুন।
নাগসেন- বায়ু ঝীব নহে, ইহা আশ্বাস- প্রশ্বাস, শরীরের ধর্ম্ম।