কুশল প্রশ্নোত্তর: প্রজ্ঞা ও করুণা - ভদন্ত এস. ধাম্মিকা


..............................................................................................................................................................................................
প্রশ্নঃ-প্রজ্ঞা ও করুণার কথা বৌদ্ধধর্ম দেশনায় প্রায় শোনা যায়। প্রজ্ঞা-করুণা বলতে কি বুঝায়?
উত্তরঃ ভালোবাসা ও করুণাকে কোন কোন ধর্মে সর্বশ্রেষ্ঠ গুণাবলী বলে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ থাকে না। প্রজ্ঞা ছাড়া ভালোবাসা ও করুণায় গুণান্বিত হয়ে আপনি একজন সহৃদয় ব্যক্তি হতে পারেন বটে, কিন্তু অবোধ থেকে যাবেন। কারণ প্রজ্ঞার অভাবে আপনার মধ্যে নানা বিষয় সম্পর্কে বিচার বুদ্ধির অভাব থেকে যাবে। বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তির কাছে করুণা-ভালোবাসার মতো কোমল অনুভূতি গুলোর গুরুত্ব নেই। এতে প্রকৃতপক্ষে একজন বিজ্ঞানী হৃদয়বৃত্তি বর্জিত রোবোটে পরিণত হন। বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত প্রযুক্তি মানুষের সেবা না করে শোষণ ও শাসনে ব্যবহৃত হতে থাকে। এর প্রমাণ মেলে বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে জীবাণু মারণাস্ত্রের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরী করার মধ্যে। আধুনিক বস্তুবাদী দর্শনে যুক্তি, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি ও মেধাকে ভালোবাসা, করুণা ও মৈত্রীর প্রতিপক্ষ বিষয় রপে অপব্যাখ্যা করা হয়। ফলে বুদ্ধিবৃত্তির সংঙ্গে হৃদয়বৃত্তির সমন্বয় ঘটে না। এতে যেখানে বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়েছে, সেখানে ধর্ম মূল্য হরিয়েছে। বৌদ্ধ দর্শনের মতে একজন প্রকৃত বিজ্ঞ মানুষের মধ্যে হৃদয়বৃত্তির ভলোবাসা ও করুণার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে হবে। বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞা ও করুণার মধ্যে সমন্বিতি গুরুত্ব আরোপনের ফলে বিজ্ঞানের সঙ্গে বৌদ্ধ দর্শনের কোন সংঘাত ঘটে না। দৈনন্দিন জীবনে কায়মনো বাক্য দ্বারা সকল কর্মে কাম-ক্রোধ-লোভ-দ্বেষ বর্জন এবং মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষা গুণাবলী অর্জনের অনুশীলন হলো প্রকৃতপক্ষে প্রজ্ঞা ও করুণার মর্মবাণী।
প্রশ্নঃ- বৌদ্ধ দর্শন মতে প্রজ্ঞা বলতে কি বোঝায়?
উত্তরঃ বৌদ্ধ দর্শনে দেশিত প্রজ্ঞার দৃষ্টিতে জীবন জগতের সবকিছু প্রকৃতপক্ষে অসম্পূর্ণ(চরম এবং চুড়ান্ত নয়), অনিত্য বা অস্থায়ী(সদা পরিবর্তনশীল) এবং অনাত্ম(আত্ম বিহীন) অর্থা নিজ বলতে কিছুই নেই, যেহেতু প্রতিমুহুর্তে নিজ অবিরাম পরিবর্তনের আয়ত্তাধীন। তবে বুদ্ধ সবার কাছে প্রজ্ঞার কথা বলতেন না। কারণ প্রজ্ঞার অর্থ হৃদয়াঙ্গম করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রজ্ঞা হলো নিজে প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করে হৃদয়াঙ্গম করা। প্রজ্ঞার বিধান হলো চারিপাশের সবকিছু স্থান, কাল বিশেষে বিশ্লেষন করে খোলা মনে সবকিছুর সত্যতা মূল্যায়ন করা। নিজের বদ্ধমূল মতামত নিয়ে আবদ্ধ থাকা নয়, অন্যের মতামত ধৈয্যের সঙ্গে শোনা ও পরীক্ষা করা। প্রজ্ঞা বলতে বোঝায় প্রচলিত সংষ্কারে নিবদ্ধ না থেকে সম্যক দৃষ্টিতে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে নিজের অভিমত স্থির করা। যথার্থ প্রমাণ ও যুক্তির আলোকে যে কোন সময় নিজের মতামত পরিবর্তন করতে প্রস্তুত থাকা। যিনি অনুরূপভাবে আচরণ করেন, তিনিই প্রজ্ঞাবান। শোনা কথা বা প্রচলিত সংষ্কারে বিশ্বাস করা সহজ। বুদ্ধ নির্দেশিত প্রজ্ঞার পথে চলতে হলে প্রয়োজন হয় সসাহস, ধৈয্য, নমনীয়তা ও বুদ্ধিমত্তা। বৌদ্ধ দর্শনের এই সব গুণাবলী হলো প্রজ্ঞার মর্মবাণী।
প্রশ্নঃ- মনে হয় বৌদ্ধ দর্শন সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য নয়। এইক্ষেত্রে দর্শনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
উত্তরঃ একথা সত্য বৌদ্ধ দর্শনের সকল বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য নয়, তাই বলে এর প্রয়োজনীয়তা নেই একথা বলা যায় না। জীবন জগতের কঠোর, কঠিন সত্য বুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতায় উন্মোচিত হয়েছে যা বৌদ্ধদর্শনে বিধৃত। এখন কেউ তা বুঝতে না পারলে, ভবিষ্যত কর্মপ্রচেষ্টায় তা পারবেন। এই কারণে বৌদ্ধরা ধৈর্য সহকারে নিরবে নিভৃতে বৌদ্ধ দর্শন বিষয়কে উপলদ্ধি করতে সচেষ্ট হন। ধ্যন অভ্যাস এজন্য অবশ্য করণীয়। বুদ্ধ করুণা পরবশঃ হয়ে মানষের দুঃখমুক্তির জন্য তাঁর সাধনালব্দ সত্য মানুষের কাছে প্রচার করেছিলেন। আমরাও সেই উদ্দেশ্যে তা প্রচার করি।
প্রশ্নঃ- এবার বলুন করুণা কি?
উত্তরঃ প্রজ্ঞা যেমন আমাদের স্বভাব-চরিত্রের বৃদ্ধি ও মেধার দিক নির্দেশ করে, করুণা অনুরূপভাবে আমাদের স্বভাব-চরিত্রের কোমল অনুভূতির দিকটি নির্দেশ করে। প্রজ্ঞার মতো করুণা একটি অপরূপ মানবিক গুণ। করুণার ভাবার্থ ইংরেজী compassion শব্দের co এবং passion দিয়ে বুঝানো যেতে পারে। co অর্থ সমবায় বা সম্মিলিত এবং passion অর্থ সহমর্মিতা বা সহানুভূতি। অর্থা করুণা বলতে কারও অবস্থা(দুঃখ-কষ্ট)কে সহানুভূতির সঙ্গে উপলদ্ধি এবং অপরের দুঃখ-কষ্ট উপশম করার সচেতন প্রচেষ্টা বুঝায়। একজন করুণাসিক্ত ব্যক্তি নিজের প্রতি যে ভালবাসা পোষণ করেন, সেই ভালোবাসাতেই অন্যের দুঃখ অনুভব করেন। নিজেকে সঠিকভাবে বুঝতে পারলেই অপরকে বুঝা সম্ভব। নিজের জন্য যা উত্তম অন্যের জন্যেও তা উত্তম মনে করেন। নিজের প্রতি সহমর্মী হবার পর অন্যের প্রতি সহমর্মী হওয়া সম্ভব হয়। বৌদ্ধিক জীবনাচরণে নিজের স্বরুপ সম্পর্কে জ্ঞাত হলে অন্যের মঙ্গল কামনা অনুভূত হয়। কারণ জগতে জীবনের স্বরুপ এমন, সেখানে সবার প্রতি করুণা ছাড়া নিজের প্রকৃত সুখ-শান্তি পাওয়া যায় না। বুদ্ধের জীবনাচরণে এই সত্যটি মহিমান্বিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি  তাঁর দীর্ঘ ৬ বছরব্যাপী কঠোর সাধনালব্দ জ্ঞান, মানুষের প্রতি করুণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রচার করেছিলেন।
প্রশ্নঃ- আপনি বলেছেন নিজের কল্যাণ করার পর অন্যের কল্যাণ করা সম্ভব। এটি কি স্বার্থপরতা নয়?
উত্তরঃ সাধারণত স্বার্থপরতা  বলতে নিজের কল্যাণে এবং নিঃস্বার্থপরতা বলতে অন্যের কল্যাণে কর্মসম্পাদন বুঝায়। এর কোনটিকে বৌদ্ধদর্শনে ঐরূপ আলাদাভাবে না দেখে দুটিকে একীভূত করে দেখা হয়।  এতে জ্ঞানের আলোকে জ্ঞাত স্বার্থ চিন্তা ক্রমশঃ স্বার্থপরতা থেকে অন্যের স্বার্থ চিন্তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আবির্ভূত হয়। সহমর্মীতা দিয়ে মা তাঁর একমাত্র সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন, সেইরূপ সহমর্মীতায় সকল জীবের প্রতি মঙ্গল কামনা হলো করুণা। বৌদ্ধিক গুণাবলী খচিত মুকুটে করুণা একটি অমূল্য রত্নের মতো শোভা পায়।
[***যথাশীঘ্র কুশলকর্ম সম্পাদনে উদ্যোগী হও। নিজের মন অকুশল কর্মে লিপ্ত কিনা পয্যবেক্ষণ করো। কুশলকর্ম সম্পাদনে বিলম্ব হলে মন অকুশলকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে।]
........................................................................................................................

কুশলপ্রশ্নোত্তরঃনিরামিষ -ভদন্ত এস, ধাম্মিকা

নিরামিষ
প্রশ্নঃ- বৌদ্ধদের নিরামিষভোজী হওয়া উচিত নয় কি?
উত্তরঃ কোন বৌদ্ধকে অবশ্যই নিরামিষাশী হতে হবে- একথা ঠিক নয়। বুদ্ধ স্বয়ং নিরামিষাশী ছিলেন না। তাঁর অনুসারীদের তিনি কখনো নিরামিষাশী হতে উপদেশ দেননি। নিরামিষাশী নন এমন প্রকৃতবৌদ্ধ বর্তমানে বহু আছেন।
প্রশ্নঃ- কিন্তু আপনি যদি মাছ-মাংস খান, তাহলে পরোক্ষভাবে প্রাণীহত্যার জন্য দায়ী হচ্ছেন, যেখানে পঞ্চশীলের প্রথম শীল লঙ্ঘন করছেন, তাই নয় কি?
উত্তরঃ হ্যাঁ, একথা অনস্বীকায্য। যদি আমি মাছ-মাংস খাই, তাহলে পরোক্ষভাবে প্রাণী হত্যার জন্য দায়ী; কিন্তু নিরামিষভোজী হলেওতো পরোক্ষভাবে প্রাণী হত্যার জন্য দায়ী হতে হয়। কারণ কৃষকরা যেখানে চাষাবাদ করেন সেখানে কীটনাশক ঔষধ ব্যবহারের ফলে কীটপতঙ্গ মারা যায়। এছাড়া ব্রবহৃত চামরার বেল্ট, ব্যাগ, সাবান প্রভৃতি তৈরীতে পরোক্ষভাবে প্রাণী হত্যা করতে হয়। অতএব প্রকৃত পক্ষে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রাণী হত্যা না করে বেঁচে  থাকা সম্ভব নয়। তাই চতুরায্য সত্যের প্রথম সত্যে বলা হয়েছে যে, বেঁচে থাকাটাই দুঃখ জনক। এইজন্য পঞ্চশীলের প্রথমশীলে প্রাণী হত্যার জন্য সরাসরি দায়ী হতে বারণ করা হয়েছে। এখানে সরাসরি কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রানীহত্যার বিষয়ে প্রাণীহত্যা হলো কিনা, তার চাইতে প্রাণী হত্যার জিঘাংসা চেতনাকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটিই প্রথমশীলের কুশল ব্যাখ্যা।
প্রশ্নঃ- মহাযানী বৌদ্ধেরা তো মাছ-মাংস খান না।
উত্তরঃ ঐ কথা সত্য নয়। চিনের মহাযানী বৌদ্ধেরা নিরামীষাশী হতে গুরুত্ব দেন বটে, তবে জাপান ও তিব্বতের মহাযানী বৌদ্ধ গৃহী এবং ভিক্ষুরাও মাছ মাংস খান।
প্রশ্নঃ- বৌদ্ধদের মাছ-মাংস খাওয়া উচিত না। এই সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?
উত্তরঃ মনে করুন, কোন ব্যক্তি নিরামিষভোজী হওয়া সত্ব্বেও জীবনাচরনে স্বার্থপর, অসদাচারী ও সংকীর্ণ। অন্য একজন নিরামীষভোজী নন, কিন্তু সদচারী, ত্যাগী ও করুণাপরবশ। এ দুজনের মধ্যে বৌদ্ধ হিসেবে কে উত্তম?
প্রশ্নকারীঃ জীবনাচরনে যিনি সদচারী তিনি অবশ্যই অপেক্ষাকৃত উত্তম।
উত্তর দাতাঃ কেন?
প্রশ্নকারীঃ কারণ ঐ ব্যক্তি আমিষভোজী হলেও সদাচারী।
উত্তরদাতাঃ প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়টি প্রধান বিচায্য বিষয়। একজন নিরামিষাশী যেমন সদাচারী হতে পারেন, একজন আমিষভোজী তেমনি সদাচারী হতে পারেন। বুদ্ধ তাঁর হিতোপদেশে মানুষের চেতনার উপর সবচেয়ে অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। জগত জীবনে সবকিছুই আপেক্ষিক, এখানে চূড়ান্ত ও চরম বলে কিছুই নেই। বিষয়টি শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আপেক্ষিক সূত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ যা বৌদ্ধ দর্শনে মজ্ঝিমপন্থা সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যাত হয়েছে।

কুশল প্রশ্নোত্তরঃ ধ্যান সমাধি- ভদন্ত এস. ধাম্মিকা

ধ্যান-সমাধি
প্রশ্নঃ- ধ্যান-সমাধি বা ভাবনা কি?
উত্তরঃ ধ্যান-সমাধি বা ভাবনা হলো, মনের কার্যকলাপ উন্নয়নের সচেতন প্রচেষ্টা। পালি ভাষায় ভাবনা অর্থ হলো গড়ে তোলা। বা বৃদ্ধি করা।
প্রশ্নঃ- ধ্যানের তাপর্য কি?     
উত্তরঃ ধ্যান বা ভাবনার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা যতই ভালো হতে চাই না কেন, তা সম্ভব হবে না, যদি আমাদের মনে স হবার সদা সচেতন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা না হয়। উদাহারণ স্বরুপ বলা যায়, নিজ স্ত্রীর প্রতি অসহনশীল স্বামী প্রতিজ্ঞা করলেন, এখন থেকে তিনি স্ত্রীর প্রতিসহনশীল হবেন। কিন্তু পরমুহুর্তে স্ত্রীর সঙ্গে চেঁচামেচি শুরু করলেন। এর কারণ তার কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি মনকে প্রহরীর মত সদাসচেতন রাখেননি। ফলে তাঁর অজ্ঞাতেই তিনি ধৈয্য হারিয়ে ফেলেছেন। ভাবনা বা ধ্যান-সমাধি নিজের মনের উপর প্রহরীর মত সদা সচেতন থাকার শক্তি ও অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
প্রশ্নঃ- আমি শুনেছি, ধ্যান কখনো কখনো বিপদজ্জনক হতে পারে; তা কি সত্য?     
উত্তরঃ এর উত্তর এভাবে দেয়া যায়। বাঁচার জন্য আমাদের লবনের প্রয়োজন। কিন্ত আপনি যদি একসঙ্গে ১ কিলোগ্রাম লবন খেয়ে ফেলেন, তাহলে আপনার মৃত্যু ঘটবে। আধুনিক জীবন যাপনের জন্য গাড়ী প্রয়োজন। কিন্তু আপনি যদি ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ী চালান, তাহলে আপনার বিপদ হবে। ধ্যান-সমাধি বা ভাবনাও তদ্রুপ। আমাদের ধ্যান অনুশীলন প্রকৃত সুখ-শান্তির জন্য অপরিহায্য, কিন্তু সঠিকভাবে চর্চা না করলে সমস্য দেখা দিবে। অনেকের ভুল ধারণা হলো মানসিক চাপ, অমূলক ভীতি এবং স্কিজোপ্রেনিয়ার মতো অসুখ ধ্যান অভ্যাসে নিরাময় হয়। এই জাতীয় অসুখে প্রথমে বিশেষজ্ঞ চিকিসকের চিকিসা নেয়া উচিত। কিছুটা সুস্থ হবার পর ধ্যান অভ্যাস শুরু করতে হয়। শুরুতে অনেকক্ষণ ধ্যান করলে ক্লান্তি আসে। ক্যাঙারু ধ্যান আরও ক্ষতিকর। এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে, কখনও নিজে বই পড়া পদ্ধতিতে ক্যঙারুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ঘন ঘন পদ্ধতি পরিবর্তন করে ধ্যান চর্চা করলে ক্ষতি হয়। কোন জটিল মানসিক রোগ না থাকলে ধ্যান সমাধি বা ভাবনা মানসিক উকর্ষ সাধনে অশেষ উপকার সাধন করে, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আধুনিক চিকিসা বিজ্ঞানীদের মতে অনেক শারিরীক রোগ মানসিক কারণে সৃষ্টি হয়।
প্রশ্নঃ-  কত প্রকার ধ্যান পদ্ধতি আছে?    
উত্তরঃ বুদ্ধ বিভিন্ন পদ্ধতির ধ্যান শিক্ষা দিয়েছেন। এক পদ্ধতি এক রকম মানসিক সমস্যার সমাধান ও মানসিক উকর্ষ সাধনে সাহায্য করে থাকে। তবে দুপ্রকারের ধ্যান পদ্ধতি সব চাইতে বেশী উপকারী। এর একটি হলো সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাস ভিত্তিক অর্থা আনাপানা স্মৃতি, অন্যটি হলো মৈত্রী ভাবনা বা মেত্তা স্মৃতি।
প্রশ্নঃ- আনাপানা পদ্ধতি কিভাবে করতে হয়?
উত্তরঃ আপনি পি অক্ষর দিয়ে শুরু  চার শব্দের চারটি সহজ ধাপে ধ্যান করতে পারেন। যেমন, প্রথম ধাপে প্লেস বা স্থান নির্বচন; এমন স্থানে বসে ধ্যান করতে হবে, যেখানে কোন গোলমাল নেই। দ্বিতীয় ধাপে পজিশন বা শরীরের অবস্থান-আরামদায়ক স্থানে হতে হবে। হাটু ভাঁজ করে আরামে কোলের উপরে বাম হাতের তালুর উপর ডান হাতের তালু রেখে, শির দাড়া (মেরুদন্ড) সোজা রেখে চোখ বন্ধ করে আসন নিন। এর বিকল্প অবস্থান হতে পারে চেয়ারে শিরদাড়া সোজা রেখে বসা। পা থেকে মাথার তালু পযর্ন্ত, নীচ থেকে উপরের দিকে পয্যায়ক্রমে প্রত্যক গিট, মাংসপেশী শিথিল করে আসন নিতে হবে। তৃতীয় ধাপে প্রাকটিস বা আসল ধ্যানানুশীলন- এতে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সময় শ্বাস ছাড়া(বিলয়) এবং শ্বাস নেয়া (উদয়) এর মধ্যে মনঃসংযোগ করা। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে নাভির ওঠানামার মধ্যে অথবা শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে মনঃসংযোগ রাখতে পারেন। চতুর্থ ধাপে পোবলেম বা ধ্যানের সময় মনঃসংযোগে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চুলকানী অনুভব, হাটুতে ব্যাথা দেখা দিতে পারে। এতে নড়াচড়া না করে, অস্থির না হয়ে, যে জায়গায় চুলকাচ্ছে বা ব্যাথা করছে সেই হাটু বা স্থান শীথিলভাবে রাখার অনুভুতি আনতে হবে। কোথাও চুলকানো অপরিহায্য হলে মনঃসংযোগ সহকারে হাত তোলা, নেয়া, চুলকানো, আবার হাত যথাস্থানে ফিরিয়ে আনা, সবই মনঃসংযোগ সহকারে করতে হবে এবং যথাশীঘ্র পুনরায় নাভি ওঠানামার মধ্যে মনঃসংযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে। এছাড়া অস্থির মন বিক্ষিপ্তভাবে এখানে-সেখানে, এবিষয় ওবিষয়ে ছোটাছুটি করে। তখন ধৈয্যের সাথে তড়াহুড়া না করে, মনঃসংযোগ যথাশীঘ্র নাভির ওঠনামার মধ্যে বারবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এভাবে অনুশীলন করতে করতে, অনুশীলন অব্যাহত রাখলে ক্রমান্বয়ে অস্থির-বিক্ষিপ্ত চিত্ত বা ছোটাছুটি করা মন স্থির হয়ে আসবে, মনঃসংযোগ শক্তিশালী হয়ে ওঠবে এবং মনের গভীরে প্রশান্ত মুহুর্ত গুলোর উদয় হবে। এক কথায় আপাদমস্তক দেহ প্রশান্ত শীথিলতায় উপবিষ্ট আসনে অথবা শয্যায় সমর্পিত করে মনকে দেহের মধ্যে সংযুক্ত করে। দেহ মনের এ গতিবিধি পয্যবেক্ষণের নাম ধ্যান, ভাবনা বা সমাধি।
প্রশ্নঃ- কতক্ষণ ধ্যান করা উচিত?   
উত্তরঃ প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন ১৫ মিনিট। তারপর প্র্রতি সপ্তাহে ৫ মিনিট করে বাড়াতে থাকুন। এভাবে প্রতি দিন ৪৫ মিনিট করে ধ্যান্ভ্যাস এবং নিয়মিত ধ্যানানুশীলন করলে অনুভব করবেন আপনার মনসংযোগের সময়সীমা বৃদ্ধিলাভে মনের বিক্ষিপ্ত ছোটাছুটি, অস্থিরতা হ্রাস পাচ্ছে, ক্রমান্বয়ে আপনি মনের ও শরীরের শিথিল, প্রশান্ত অনুভূতিপূর্ণ মুহুর্তের সন্ধান পাচ্ছেন।
[*** আপনি যদি এমন ব্যক্তির সন্ধান পান, যিনি অনুসন্ধানী দৃষ্টিনিয়ে আপনার ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন করতে আগ্রহী সেই ব্যক্তিই আপনার কল্যাণমিত্র।]
প্রশ্নঃ- মেত্তাভাবনা ধ্যান কিভাবে করতে হয়?
উত্তরঃ আনাপানা পদ্ধতির ধ্যানাভ্যাস রপ্ত হবার পর মেত্তাভাবনা পদ্ধতির ধ্যান শুরু করতে হয়। আনাপানা পদ্ধতিতে ধ্যান করার পর মেত্তভাবনা পদ্ধতি শুরু করবেন। এটি সপ্তাহে ২/৩বার করতে পারেন। এই পদ্ধতি হলো- প্রথমে নিজের উদ্দেশ্যে মনে মনে বলুন, আমি যেন ভালো থাকি, সুস্থ থাকি, ধীর-স্থির থাকি, বিপদমুক্ত, রোগমুক্ত ও শত্রুমুক্ত হই; আমার মন দ্বেষমুক্ত হোক, অন্তর মৈত্রী-করুণাময় হোক। এরপর অনুরুপ মঙ্গল কামনা প্রথমে আপনার প্রিয়(বাবা-মা, শিক্ষাগুরু, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী) ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে, তারপর নিরপেক্ষ (আপনার প্রিয়ও নয় অপ্রিয়ও নয়) ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে, সবশেষে আপনার পছন্দ নয় এমন ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে করুন। মনে মনে বলুন, এরা সবাই যেন নিজের মতো সুখে-শান্তিতে বসবাস করেন।

প্রশ্নঃ- মেত্তভাবনার উপকারীতা কি?
উত্তরঃ আপনি আন্তরিক অনুভূতি নিয়ে সবার মঙ্গল কামনা করলে, নিজের মধ্যে প্রশান্তিময় এক শুভ চেতনা অনুভব করবেন। দেখতে পাবেন, আপনি সবার কাছে ক্রমশঃ গ্রহণযোগ্য, ক্ষমাশীল হয়ে উঠেছেন, আপনার প্রিয় ব্যক্তিদের প্রতি আপনার ভালবাসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাদের প্রতি আপনি উদাসীন ছিলেন, আপনার ক্ষোভ ও বৈরীভাব ছিল, তাদের প্রতি অকুশল ভাব হ্রাস পেয়ে করুণা-উপেক্ষা-মৈত্রী ভাবের উদয় হচ্ছে। এসনকি গভীর মনোসংযোগের ধ্যানে কোন রোগীকে অন্তঃর্ভূক্ত করলে রোগীর অবস্থার উন্নতি ঘটবে।

প্রশ্নঃ- ঐ ব্যাপারটি কিভাবে সম্ভব হয়?
উত্তরঃ মনকে সম্যকভাবে ধ্যানের একাগ্রতায় সংগঠিত করতে সফল হলে, মন এক শক্তিশালী যন্ত্রের মত শক্তি সঞ্চয় করে। মনের ঐ শক্তিকে অন্যের প্রতি যথার্থভাবে প্রয়োগ করতে সফল কাম হলে তা কায্যকরী হয়ে উঠে। আপনার এমন অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে, অনেক লোকের ভীড়ের মধ্যে আপনি অনুভব করছেন, কেউ আপনাকে লক্ষ্য করছেন। এর কারণ, আপনার মননশক্তি ঐ ব্যক্তির গ্রাহক যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে। এটি মেত্তাভাবনার প্রভাব যা ভাবনাকারী পয্যবেক্ষণ করবেন।

প্রশ্নঃ- ধ্যান শিক্ষার জন্য কি কোনও শিক্ষকের প্রয়োজন?
উত্তরঃ শিক্ষক অপরিহায্য নয়। তবে অভিজ্ঞ ব্যক্তির নির্দেশ অবশ্যই সাহায্য করে। দুর্ভাগ্য বশতঃ অভিজ্ঞ শিক্ষক পাওয়া যায় না। ভালভাবে অনুসন্ধান করে প্রশিক্ষক নির্বাচন করা উচিত। তা না হলে বিপরীত ফল হতে পারে।
প্রশ্নঃ- শোনা যায় মনস্তত্ববিদ কিংবা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি তাদের কাজে ধ্যান পদ্ধতি ব্যবহার করছেন; একথা কি সত্য?
উত্তরঃ কথাটি সত্য। সম্প্রতি রোগ চিকিসায় ধ্যান-পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বিশেষতঃ আত্মসচেতনতা সৃষ্টি, অমূলক ভীতি দূরীকরণ কিংবা দুচিন্তাগ্রস্থ রোগীর প্রশান্তি প্রদানের জন্য। বুদ্ধের আবিষ্কৃত বিশ্লেষনধর্মী মনের তথ্য অদ্যাবধি মানুষকে অজ্ঞানজনিত দুঃখ থেকে মুক্তি দিয়ে অপ্রমেয় শান্তি প্রদান করে যাচ্ছে।
[*** যে ব্যক্তি অন্যকে সশিক্ষার উপদেশ দেন এবং অকুশল কর্ম থেকে বিরত রাখেন তিনি সলোকের প্রিয় ও অসলোকের বিরাগভাজন হন।]
[*** যিনি অকুশল কর্ম করেছেন, তিনি যেন পুনর্বার তা না করেন, তিনি যেন কুশল কর্মে আনন্দ এবং অকুশল কর্মে দুঃখবোধ করেন।]