কুশল প্রশ্নোত্তরঃ পুনঃর্জন্ম - ভদন্ত.এস ধাশ্ম্মিকা

প্রশ্নঃ- মানুষ কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়?
উত্তরঃ এর তিনটি সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে। ঈশ্বরে বিশ্বাসীরা দাবী করেন, জন্মগ্রহণের আগে জীবনের অস্তিত্ব থাকে না, ঈশ্বরের ইচ্ছায় তার সৃষ্টি হয়। জন্মের পর জীবন যাপন, এবং পরিশেষে মৃত্যুর পর ব্যক্তিসত্বার অনন্ত কালের স্বর্গে কিংবা নরকে গমন হয়। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা দাবী করেন, প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতে মানুষের জন্ম হয় এবং জীবনকাল অতিবাহিত হবার পর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। বৌদ্ধেরা ঐ দুটির কোনটিই বিশ্বাস করেন না।
প্রথম ব্যাখ্যায় নীতিগত ত্রুটি এই যে, ঈশ্বর যদি সৃষ্টি করেন, তাহলে কোন কোন মানুষ কেন নানা পঙ্গুত্ব নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেন, কেন কিছু ভ্রুণের গর্ভপাত হয়, কেনইবা মৃত সন্তানের জন্ম হয়। এছাড়া ৬০/৭০ বছরের জীবনব্যাপী কৃতকর্মের শাস্তি কিংবা পুরষ্কার রপে কেন অনন্তকাল ধরে নরক যন্ত্রণা কিংবা স্বর্গে সুখ ভোগ করতে হয়। এটি যুক্তি সঙ্গত নয়।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি প্রথমটি অপেক্ষা যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও এতে কিছু অমীমাংসীত প্রশ্ন  থেকে যায়। মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত, বিশ্বব্রহ্মান্ডে মানুষের মস্তিষ্কের মত এত জটিল  প্রত্যঙ্গ এখনও সৃষ্টি হয়নি। জীবপ্রকৃতির এই মনুষ্য প্রজাতির ডিম্বানু ও শুক্রানুর সমন্বয়ে কিভাবে এত জটিল চিত্ত চেতনা কাযর্ক্রম প্রক্রিয়ার জন্ম হতে পারে?
কি করে আধুনিক বিজ্ঞান শাখার টেলিপ্যাথিপ্যারাসাইকোলজি সংক্রান্ত মনের ক্রিয়াকলাপ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই জটিল প্রশ্ন অমীমাংসীত থেকে যায়। মানুষের পূবর্র্ত জন্ম সম্পর্কে বৌদ্ধ দর্শনের ব্যাখ্যা হলো, জন্ম থেকে মৃত্যু আবার কর্ম অজির্ত ব্যক্তিসত্ত্বার মননশীলতা, প্রবণতা, মুখ্যতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মৃত্যুর পর কায্যকারণ প্রক্রিয়ায় যথোপযুক্ত ডিম্বাণুতে সম্পৃক্ত হয়, যা নিষিক্ত হয়ে পুনজর্ন্ম লাভ করে। নতুন ব্যক্তি সত্ত্বায় পূরব জীবনে অর্জিত মননশীলতা, মা-বাবার জিন্-গত প্রভাব, পারিবারীক, সামাজিক, প্রশিক্ষণ, বর্তমান জীবনের ব্যক্তিসত্ত্বা গঠনে প্রভাব ফেলে। এভাবে জন্ম-মৃত্যুর প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতদিন জন্মপ্রবাহের উপাদান ভবতৃঞ্চা বিদ্যমান থাকবে। প্রজ্ঞার আলোকে জীব সত্ত্বার স্বরূপ উপলদ্ধিতে জন্মপ্রবাহের উপাদান ভবতৃঞ্চা বিলুপ্ত হলে মননশীলতার এমন স্তর অজির্ত হতে পারে, যেখানে সত্ত্বার সুখ-দুঃখ-বেদনা একাকার হয়ে নিবার্ণপিত হয়। ফলে  পুনজর্ন্ম রুদ্ধ হয়। সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশা, যশঃ-অযশঃ, নিন্দা-প্রশংসায় অকম্পিত প্রশান্তিতে বিলীন প্রাপ্ত মানসিক এই অবস্থার নাম নিবার্ণ। নিবার্ণই বৌদ্ধিক ব্যক্তির একমাত্র লক্ষ্য।

প্রশ্নঃ- মনের তো কোন বস্তুসত্ত্বা নেই, কি করে মন এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হতে পারে?
উত্তরঃ মানসিক প্রবাহ দেহ থেকে দেহান্তরে যাবার প্রক্রিয়াকে বেতার তরঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বেতার তরঙ্গে কোন শব্দ বা সঙ্গীত-রাগ থাকে না; থাকে শক্তি তরঙ্গ, যা কস্মিক শক্তি হিসেবে প্রবাহিত হয়ে গ্রাহক যন্ত্রে যুক্ত হয়ে শব্দ কিংবা সঙ্গীত হয়ে প্রচারিত হয়। অনুরূপ কার্যকারণ প্রক্রিয়াতে মৃত্যুর পর ব্যক্তি সত্ত্বার মননশক্তি সুনির্দিষ্ট ডিম্বানুতে আকৃষ্ট হয়ে ভ্রুণ বৃদ্ধিলাভ করে। বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সময় মস্তিষ্কের সাহায্যে নতুন ব্যক্তি সত্তা সংগঠিত হয়ে জন্মলাভ করে।
প্রশ্নঃ- মৃত্যুর পর কি মানুষ হয়ে সবার জন্ম লাভ হয়?
উত্তরঃ কোন ব্যক্তিসত্তার কোথায় জন্মলাভ হবে, তা কার্যকারণ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়। কেউ স্বর্গ সুখ, কেউ নরক যন্ত্রণা, আবার কেউ তৃঞ্চার্ত লোভচিত্ত নিয়ে  জন্ম নেয়। প্রকৃতপক্ষে স্বর্গ-নরক রূপে কোন আলাদা ভৌগলিক অবস্থান নেই। এটি শারিরীক ও মানসিক চেতনাগত জীবনানুভূতি। স্বর্গসুখানুভূতিও নরকদুঃখানুভূতির মেয়াদ সীমীত। মেয়াদ শেষে কার্যকারণ প্রক্রিয়ায় কর্মার্জী জীবন নিয়ে হয় জন্মলাভ, যা মানুষ রপেও হতে পারে।
প্রশ্নঃ-  সত্তার কোথায় পুনজর্ন্ম হবে, তা কিসের উপর নির্ভর করে?
উত্তরঃ কৃতকর্মই এর নির্ধারক। কর্ম বলতে আমাদের সচেতন মনোগত ক্রিয়া কর্মকে বুঝায়। অতীত জীবনের কমর্ফলে বতর্মান জীবনের এবং বতর্মান জীবনের কমর্ফলে ভবিষ্যত জীবনের অবকাঠামো তৈরী হয়। মৈত্রী-করুণার আদর্শ চর্চায় ব্যক্তিসত্তার মধ্যে স্বর্গসুখ নিয়ে পুনর্জন্মের প্রবণতা, আর দুচিন্তাগ্রস্থ, নির্দয়, কামাসক্ত ব্যক্তি সত্তার মধ্যে নরকযন্ত্রণা নিয়ে পুনর্জন্মের প্রবণতা বিদ্যমা থাকে। বতর্মান জীবনের প্রবল মননশীলতা পরবর্তী জীবনে প্রবাহমাণ থাকে। তবে অধিকাংশ মানুষের মনুষ্য জীবন নিয়ে পুনর্জন্মের সম্ভাবনা থাকে। অতীত জীবনের কর্মফল বতর্মান জীবনের এবং বতর্মান জীবনের কমর্ফল ভবিষ্যত জীবনের অবকাঠামো তৈরী করে। একে অনেক সময় অদৃষ্ট বলে অপব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।
প্রশ্নঃ- আমাদের জীবন কি কোনও অদৃশ্য শক্তির দ্বারা প্রভাবিত নয়? শুধু কর্ম  দিয়েই পরিবর্তিত ও প্রভাবিত হয়?
উত্তরঃ আপন কর্মফল ছাড়া কোনও অদৃশ্য শক্তির এতে কোনও ভূমিকা নেই। কৃতকর্মের সাহায্যেই জীবন পরিবর্তন করা যায়। এই কারণেই আর্য অষ্টাঙ্গীক মার্গের একটি কমর্পন্থা হলো, সম্যক ব্যায়াম বা চেষ্টা। এই কর্মপ্রচেষ্টা কোন ব্যক্তির আন্তরিকতা কত প্রবল, তার উপর নির্ভর করবে এর ফলাফল। অনেকে আছেন যারা আপন মন্দ স্বভাব বদলাতে উদ্যোগী নন, পূর্ব কর্ম নির্ধারিত দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে সচেষ্ট নন; আবার অনেকে আছেন, যাঁরা অকুশলকর্ম বর্জন করে কুশলকর্মে ব্রতী হন। স্বভাব বদলানোর জন্য ধ্যান অপরিহার্য। কুশল কর্মে উদ্যোগ এবং অকুশল কর্ম বর্জনে সুফল লাভ হয়। একজন বৌদ্ধের লক্ষ্য হলো, নিজেকে দোষমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় অতীত জীবনে আপনার স্বভাবে যদি ধৈর্য, দয়ার অনূভূতি প্রবল থাকে তাহলে বর্তমান জীবনে সেই স্বভাব প্রবল থাকবে। বতর্মান জীবনে সেই গুণাবলীর আরও অনুশীলনের ফলে তা অধিকতর প্রবল হয়ে বিকাশ লাভ করবে। তবে এ কথা সত্য যে, দীর্ঘদিনের পুরাতন স্বভাব বদলানো কষ্টকর। যা একমাত্র ধ্যানের সাহায্যে আয়ত্ত করতে হয়। ধৈয্যশীল ও দয়াবান মানুষের সুসম্পর্ক থাকে সবার সঙ্গে। ফলে তিনি সবার মধ্যে সম্মানিত হয়ে সুখীজীবন যাপন করেন। অন্য একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। মনে করুন আপনি অতীত জীবনে ধৈয্যশীল, দয়াবান, মৈত্রীভাবাপন্ন ছিলেন। বতর্মান জীবনে সেই গুণাবলীর প্রভাব নিয়ে আছেন; কিন্তু সেই গুণাবলীর অনুশীলন করে যদি আরও বিকাশ সাধনে উদ্যোগী না হন, তাহলে ক্রমশঃ ঐ গুণাবলীর লোপ পাবে। আপনার মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, রাগ, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি প্রবল হয়ে দেখা দিবে। পক্ষান্তরে অতীত জীবনের খিটখিটে মেজাজ, রাগ, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি বর্জন করার অনুশীলনের ফলে কুশল গুণাবলী অর্জনে সফল হলে সুফল পাবেন, ব্যর্থ হলে কুফল ভোগ করবেন।
বলাবাহুল্য উক্ত সুফল-কুফল প্রাপ্তি, কার্যকারণ প্রক্রিয়াতে সংঘটিত হয়। এখানে অদৃশ্য দ্বিতীয় অলৌকিক শক্তির কোন ভূমিকা নেই।
প্রশ্নঃ- আপনি পুর্নজন্ম সম্বন্ধে অনেক কথা লেছেন এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ আছে?
উত্তরঃ এর স্বপক্ষে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে। অতীত জীবনের স্মৃতি নিয়ে জন্মলাভের প্রকাশিত খবর নিয়ে গত প্রায় ৩০ বছর ধরে মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। উদাহরন স্বরূপ উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডের ৫ বছর বয়সী একজন মেয়ে পোল্যান্ডে তাঁর অতীত জীবনের মা-বাবার, সেখানকার বাড়ীর ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন এবং কিভাবে ২৩ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২ দিন পর মারা যান, তার নিখুঁত বর্ণনা দেন। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে তাকে প্রশ্ন করে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন। এটিই একমাত্র ঘটনা নয়। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইয়েন ষ্টিভেশন্ তাঁর রচিত গ্রন্থে অনুরূপ কয়েক ডজন  ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যাতে বৌদ্ধদর্শনে ব্যাখ্যাত পূনর্জন্মের সত্যতা প্রমাণ করে।[সূত্রঃ ইউনিভাসিরটি প্রেস অব ভাজির্নিয়া, চারলোটেভিলি, ইউ, এস, এ, ১৯৭৫ পুনজর্ন্ম সম্পর্কিত ২০টি ঘটনা]
প্রশ্নঃ- কেউ কেউ মনে করেন অতীত জীবনের স্মৃতির ব্যাপারটি ভৌতিক হতে পারে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?
উত্তরঃ কেউ কোন বিষয়ে বিশ্বাস করেন না- এই অজুহাতে বিষয়টিকে ভৌতিক ব্যাপার বলে উড়িয়ে দিতে পারেন না। কোন বিষয়ে ভিন্নমত পোষনের স্বপক্ষে আপনার উচিত গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দেয়া। ভৌতিক কারসাজির স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। ভৌতিক ব্যাপারটি কুসংষ্কারের অন্ধবিশ্বাস।
প্রশ্নঃ- আপনি বলেছেন ভৌতিক কারসাজি কুসংস্কার। পুনজর্ন্মের ব্যাপারটি কি কুসংস্কার নয়?
উত্তরঃ অভিধানিক অর্থে  কুসংষ্কার হলো এমন ধাণা যার স্বপক্ষে কোন যুক্তি নির্ভর তথ্যপ্রমাণ নেই। এটি ভোজবাজী ম্যাজিকের মতো। ভৌতিক ঘটনাগুলো প্রমাণের স্বপক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক বা বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিত্তিক তথ্য-প্রমাণ নেই তাই এটি কুসংষ্কার। কিন্তু পূনজর্ন্ম সম্পর্কে পূর্বোল্লিখিত সমীক্ষা বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত ও বিজ্ঞান সম্মত। অতএব কুসংষ্কার বলে এটি উড়িয়ে দেয়া যায় না।
প্রশ্নঃ- এমন কোন বিজ্ঞানী আছেন যিনি পূর্বজন্মে বিশ্বাস করেন?    
উত্তরঃ আছেন। থমাস্ হাক্সলের নাম উল্লেখ করতে পারি। এই বিজ্ঞানী উনবিংশ শতাব্দীর বৃটিশ বিজ্ঞান গবেষণার পথিকৃত। ডারউন তথ্যের সত্যতা তিনি প্রমাণ করেন। তাঁর মতে পূর্বজন্ম একটি বিজ্ঞান সম্মত সত্য। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইভলিয়শান এন্ড এথিক্স এন্ড আদার এসেস্-এ লিখেছেন, ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধধর্মের ইতিবৃত্তান্তে ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, বিশ্ব প্রকৃতির কসইমক শক্তির সঙ্গে মনুষ্য জীবনের আন্তঃ গমন-নির্গমন তথ্যে সত্য নিহিত আছে। গভীর বিশ্লেষনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয় না বলে সত্যটি অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। জীবজগতের  বিবর্তন তত্ত্ব ও পুনর্জন্ম তত্ত্ব সমতুল্য
এ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের  সহকর্মী সুইডিস জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ও পদার্থ বিজ্ঞানী অধ্যাপক গুনটেপ্ স্ট্রমবার্গ এর পূনর্জন্ম সম্পর্কে মন্তব্য হলো- মানুষের  আত্মার পূনর্জন্ম হয় কিনা, সে সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ আছে। ১৯৩৬ সালে  ভারত সরকার একটি বিষ্ময়কর ঘটনার  অনুসন্ধান করে রিপোর্ট প্রদান করে। দিল্লীতে বসবাসকারী শান্তি দেবী নামের এক বালিকা দিল্লী থেকে ৫০০ মাইল দূরবর্তী মথুরায় তাঁর পূর্বজন্মের স্মৃতি সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দেয়। তাঁর স্বামীর, সন্তানদের নাম, বাড়ীর ঠিকানা এবং প্রতবেশীদের নিয়ে নানা ঘটনার পুংখানুপুঙ্খ বর্ণনার সত্যতা যথাযথ অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের আরও ঘটনা মানুষের স্মৃতির অবিনাশ থাকার সত্যতা প্রমাণ করে। বৃটিশ বিজ্ঞানী, ইউনেস্কোর ডাইরেকটার জেনারেল অধ্যপক জুলিয়ান হাসলের মন্তব্য হলো-পুনর্জন্ম বিজ্ঞান সম্মত। বেতার মাধ্যমে সংবাদ প্রচারের সঙ্গে পুনর্জন্ম প্রক্রিয়ারমিল আছে। বেতারে সংবাদ প্রেরণ ও গ্রাহক যন্ত্রে ধারণ প্রক্রিয়ার মতো পূনর্জন্ম  প্রক্রিয়ায় দেহ থেকে দেহান্তরে প্রবাহিত হবার ক্ষেত্রে আত্মসত্তার ভূমিকা বিদ্যমান। মন ঐ ভূমিকার চালিকাশক্তি
আমেরিকার শিল্পপতি হেনরীফোর্ডের মত একজন বাস্তববাদী ব্যক্তিত্বের পূনর্জন্ম সম্পর্কে বক্তব্যঃ
আমি আমার ২৬ বছর বয়সে পুনর্জন্মে বিশ্বাসী হই। আমার নিজ ধর্ম বিশ্বাসে এ ব্যাপারে কোন ভূমিকা ছিল না।পুপূর্ব জন্মে বিশ্বাসের ফলে আমার জীবনের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার সুযোগ পাবার স্বস্তিবোধ করি। এক জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ও অভিজ্ঞতার অসমাপ্ত কাজ যদি এ জীবনে সম্পন্ন না হয় তাহলে আমার অনেক পরিশ্রম পন্ডশ্রমে পর্যবশিত হবার আশঙ্কা ছিল। পুনর্জন্মে বিশ্বাসের ফলে মনে হয়, আমার কাজের সমৃদ্ধি ও সংশোধনের সুযোগ পাব। আমি আর সময়ের দাস নই। অনেকে মনে করেন প্রতিভা একটি অনুদান। প্রকৃতপক্ষে প্রতিভা হলো অভিজ্ঞতার ফসল। অভিজ্ঞতার ফসল প্রতিভা বিকাশের সুযোগ যদি এ জীবনে সম্পন্ন করার সুযোগ পাবো এই বিশ্বাসে আমার কর্ম পরিকল্পনা বৈশ্বিক পর্যায়ে বিস্তৃত করার তাগিদ অনুভব করি। আমি এই অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে জানাতে চাই
উপরের পর্যলোচনায় স্পষ্ট ধারণা জন্মে, পুনর্জন্ম একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞান ভিত্তিক বিষয়। বস্তুতপক্ষে বিষয়টি যথার্থ উন্নীত জীবন স্তরে গিয়ে উপলদ্ধির বিষয়, গবেষণাগারে পরীক্ষার বিষয় নয়। এ জীবনের ভুল সংশোধন করা যাবে না অসমাপ্ত কাজ করার সুযোগ থাকবে না, এইরূপ চিন্তাধারা জীবনমূখী নয়। পুনর্জন্ম আমাদের সেই সুযোগের আশ্বাস দেয়। বৌদ্ধ দর্শনের লক্ষ্য নির্বাণ লাভ এ জীবনে না হলে পরবর্তী জীবনে সেই সাধনা অব্যাহত থাকবে। এ জীবনের ভুল, অসম্পূর্ণতাগুলি পরবর্তী জীবনে সংশোধন ও সমাপ্ত করার, ভুল থেকে শিক্ষা লাভ করার, এ জীবনে যা অর্জিত হয়নি তা পরবর্তী জীবনে অর্জনের সম্ভাবনার কথা কি অপূর্ব আনন্দময়!
[দুগ্ধ যেমন সঙ্গে সঙ্গে দধি হয় না, সুকর্ম, কুকর্মও তেমনি সঙ্গে সঙ্গে সুফল, কুফল দেয় না। ভস্ম দিয়ে আচ্ছাদিত শিখাহীন আগুনের মতো অকুশলকারী কে যথাসময়ে কুফল দেয়। সুফল, কুফল প্রপ্তি শুধু সময়ের ব্যাপার।]
........................................................................................................

কুশল প্রশ্নোত্তরঃ পঞ্চশীল - ভদন্ত এস. ধাম্মিকা

প্রশ্নঃ- বৌদ্ধ দর্শনে কি জীবনাচরণের কোনও নীতিমালা আছে?
উত্তরঃ অবশ্যই আছেপঞ্চশীলই বৌদ্ধ জীবনাচরণের নীতিমালাপঞ্চশীলের প্রথম শীলে কোন জীবহত্যা কিংবা কোনও প্রাণীর শারিরীক ও মানসিক আঘাত করা হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়া হয়েছেদ্বিতীয় শীলে প্রাপ্য নয়, এমন কোন বস্তু নিজের অধিকারে আনা হতে বিরত থাকার; তৃতীয় শীলে, যে কোন প্রকারের যৌন অনাচার থেকে বিরত থাকার; চতুর্থ শীলে, নিজের ও অন্যের ক্ষতি করতে পারে এমন বাক্যালাপ থেকে বিরত থাকার এবং পঞ্চম শীলে, মদ্যপান কিংবা শারিরীক ও মানসিক ক্ষতি করতে পারে ঐরূপ খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়া হয়েছে
[অপরের দোষের দিকে, অপরের কৃতকর্ম সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণ ভাবে সম্পাদিত হলো কিনা, তার দিকে দৃষ্টি দেয় নাশুধুমাত্র নিজের কর্ম সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণভাবে সম্পন্ন হলো কিনা তার দিকে মনোনিবেশ করা, এবং বিচার বিশ্লেষণ করা উচিত।]
প্রশ্নঃ-কিন্তু মাঝে মাঝে প্রাণী হত্যা করা ভালোযেমনঃ রোগ সংক্রমণকারী কীট  অথবা কেউ যদি আপনাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তাহলে তাকে হত্যা করা কি উচিত নয়?
উত্তরঃ কাউকে হত্যা করা আপনার জন্য ভালো হতে পারে, কিন্তু যাকে হত্যা করা হলো তার অবস্থা কল্পনা করুনআপনার মতো সেই প্রানীটিও বাঁচতে চায়রোগ সংক্রমণকারী কীট মারার মধ্যে মিশ্রিত কর্মফল বিদ্যমানএখানে আপনার উপকার সেই প্রাণীর জন্যে অপকারী(মন্দফল) ফল বিদ্যমানদৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যায়- চলার পথে জীবন্ত কেঁচোকে রজ্জুখন্ড ভেবে পায়ে মাড়ালে প্রাণী হত্যার অকুশল কর্ম হবে নাপক্ষান্তরে জড় রজ্জুখন্ডকে জীবন্ত কেঁচো ভেবে পায়ে মাড়ালে প্রাণী হত্যার অকুশল কর্ম বলে গণ্য হবে
কখনো কখনো প্রাণী হত্যার প্রয়োজন হতে পারে বটে তবে তা কখনো সর্বাঙ্গীন ভাল কর্ম  নয় প্রকৃতপক্ষে কায়মনো বাক্যে কৃত সকল কর্মে বুদ্ধ চেতনাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেনহত্যার চেয়ে জিঘাংসা মনোবৃত্তি এখানে তাপর্যপূর্ণযেমন রোগ-চিকিসায় জীবণু বিনাশী ঔষধ ব্যবহারের সময় জীবাণু বিনাশী জিঘাংসার চেয়ে রোগ নিরাময় চেতনা মুখ্য থাকে
প্রশ্নঃ- আপনারা বৌদ্ধরা কীট-পতঙ্গ নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেন, তাই নয় কি?
উত্তরঃ বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণে ছোট-বড় নির্বিশেষে সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী করুণা বৌদ্ধিক দৃষ্টিতে সমগ্র বিশ্ব্ প্রকৃতিকে পরস্পর নির্ভরশীল ও একক মনে করা হয়বিশ্ব প্রকৃতির ভারসাম্য  রক্ষায় প্রত্যেক জড়-জীবের সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় ভূমিকা আছেতাই বিশ্ব প্রকৃতির এই ভারসাম্য ছিন্ন করার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিতএকটু লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, যাদের জীবনাচরণে প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু ব্যবহার করে নিশেষ করার প্রবণতা আছে, কিন্তু পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই, প্রকৃতির প্রতিশোধ মূলক রুদ্ররোষে পড়তে হয় তাদেরভারসাম্য নষ্ট করার ফলে বায়ুমন্ডল দুষণ, জল বিষাক্ত হয়ে নদ-নদী নিশেষ, মনোমুগ্ধকর পশুপাখীর বিলুপ্তি, পাহাড়-পর্বতের মালভূমি ও কৃষিভূমি ধসে নিষ্ফলা, এমনকি তুচক্রও পরিবর্তন হয়ে যায়মানুষ যদি কিঞ্চিত সহণশীল হয়ে পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে প্রাণী নিধন, বনসম্পদ উজাড় পাহাড়-পর্বত ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকে এই ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে না
জীবজগতের প্রতি আমাদের উচিত আরও অধিক মমত্ববোধ গড়ে তোলাএই বিষয়টি পঞ্চশীলে বিধৃত হয়েছে
প্রশ্নঃ- পঞ্চশীলের তৃতীয় শীলে যৌন অনাচার থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেয়া হয়েছেযৌন অনাচার কি?
উত্তরঃ ছল-চাতুরী, ভাবাবেগের কৌশলে কিংবা ভয়-ভীতি প্রদর্শনে যৌনসংগম হলো যৌন অনাচারবিয়ের সময় স্বামী-স্ত্রী উভয়ে নিজেদের যৌনাচার সম্পর্কে বিশ্বস্ত থাকার অঙ্গীকারাবদ্ধ হনএর লঙ্ঘনে অবিশ্বস্ততার অপরাধে দোষী হিসেবে গণ্য হতে হয়যৌন মিলন হলো স্বামী-স্ত্রী দুজনের মধ্যে প্রেম-ভালবাসা, আন্তরিকতা ও মানসিক ভাবাবেগের বহিঃপ্রকাশসম্প্রতি এইডস রোগের বিশ্বব্যাপী মারাত্মক প্রকোপ এই শীল ভঙ্গের কর্মফল
[অস্থির-অশান্ত ও চঞ্চল মনের নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়জ্ঞানী ব্যক্তি তীরন্দাজের তীর দিয়ে লক্ষ্যবস্তু স্থির করার ন্যায় মনকে লক্ষ্যের মধ্যে স্থির রাখেন]
প্রশ্নঃ- বিয়ের আগে যৌন সংগম কি যৌন অনাচার?
উত্তরঃ দু'জনের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ভালবাসা থাকলে তা যৌন অনাচার রূপে গণ্য হতে পারে না বটে, কিন্তু প্রাকৃতিক বিধানে যৌন মিলনের উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জৈবিক প্রজনন অবিবাহিত নারী অন্তঃসত্তা হলে কি ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন অথবা প্রাকৃতিক বিধানে কি শাস্তি পেতে হয়, তা মনে রাখ অবশ্য কর্তব্য
অভিজ্ঞ বিবেকবান মনিষীদের উপদেশ হলো বিয়ের আগে যৌন সংগম হতে বিরত থাকা মঙ্গলজনক এইরূপ অসংযত জীবনাচারের ফলে অনেকে যৌন ব্যাধির শিকার হচ্ছেন
........................................................................................................

কুশল প্রশ্নোত্তরঃ বৌদ্ধ দর্শনে ঈশ্বর - ভদন্ত.এস ধাশ্মিকা

প্রশ্নঃ- বৌদ্ধরা কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?
উত্তরঃ না, বৌদ্ধেরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন নাএর স্বপক্ষে কয়েকটি যুক্তি আছে আধুনিক সমাজ-বিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মতো বুদ্ধ বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরে বিশ্বাসের বিষয়টি মানুষের মনের ভয়-ভীতি থেকে সৃষ্টবুদ্ধ বলেছেন, ভয়ার্থ মানুষ তথাকথিত পবিত্র পাহাড়-পর্বতে, গুহায়, পবিত্র বৃক্ষের তলায় কিংবা দেব-দেবীর স্মৃতি মন্দিরে নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেনআদিম অধিবাসী মানুষকে ভয়াবহ বিপদজনক প্রতিকূল পরিবেশে বসবাস করতে হতোচারপাশে হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের ভয়, ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব, শারিরীক আঘাত ও রোগের যন্ত্রণা, বিদ্যু চমকানো বজ্রাঘাত এবং আগ্নেয়গিরির ভয় সংকুল পরিবেশে মানুষ নিজেকেঅসহায় বোধ করতোকোথাও নিরাপত্তা খুজেঁ না পেয়ে ভয়ার্থ মানুষ নিরাপত্তার আশ্রয় হিসেবে ঈশ্বর কল্পনা করেনঈশ্বরের কাছে বিপদের সময় সাহস, দুঃসময়ে সান্তনা এবং সুসময়ে স্বস্তি লাভ করেনআপনি লক্ষ্য করবেন বিপদে পড়লে মানুষ বেশী ধার্মীক হয়ে উঠেনবিপদ সংকট উত্তরণের জন্য দেব-দেবী বা কোন অদৃশ্য শক্তির কাছে প্রার্থনা করা হয়, যাতে সেই শক্তি বিপদশুক্ত করেনএতে বিপদগ্রস্ত মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার হয়যাঁরা যেই দেব-দেবীতে বিশ্বাসী, তাদেঁর প্রার্থনা অভিষ্ট সেই দেব-দেবী শোনেন এবং সাড়া দেন বলে বিশ্বাস করা হয়প্রকৃতপক্ষে, অজ্ঞতা জনিত ভয়ের কারণে ঐরূপ বিশ্বাস সৃষ্টি হয়ভয়ের কারণ বিজ্ঞান ভিত্তিক যুক্তির সাহায্যে বিশ্লেষণ করতে , হতাশার কারণ অনিয়ন্ত্রিত ভোগতৃঞ্চা প্রশমিত করতে এবং অপ্রতিরোধ্য বিষয়গুলোকে শান্ত, ধৈর্যশীল ও সাহসী হয়ে মোকাবিলা করার জন্য বুদ্ধের উপদেশ প্রণিধানযোগ্য
ঈশ্বরে বিশ্বাস না করার দ্বিতীয় কারণ হলো ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবঈশ্বরে বিশ্বাসী ধর্মগ্রন্থ সমূহে ঈশ্বর বিশ্বাস সম্পর্কে নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে উদ্ধৃত বিষয়সমূহ সঠিক, অন্যদের  সঠিক নয় বলে দাবি করা হয়কেউ ঈশ্বরকে পুরুষ, কেউ ঈশ্বরকে নারী, আবার কেউ ক্লিব হিসেবে বিশ্বাস করেনপ্রত্যেকের নিজ নিজ বিশ্বাস সত্য, অন্যদের বিশ্বাস মিথ্যা বলে দাবি ও উপহাস করেনবিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই যে, বিগত শত শত বছর ধরে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে তর্ক বিতর্কের উর্ধে, সুনিশ্চিত ও বিজ্ঞানসম্মত কোনও সাক্ষ্য প্রমাণ অদ্যাবধি পাওয়া যায়নিসেই কারণে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত, বৌদ্ধরা বিষয়টি মুতবি রেখে দিতে চান
ঈশ্বরে বিশ্বাস না করার তৃতীয় কারণ হলো, শুদ্ধ সার্থক জীবন যাপনে ঈশ্বরে বিশ্বাসের প্রয়োজন নেইঅনেকে মনে করতে পারেন, বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির রহস্য উদ্ধারের জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসের প্রয়োজনকিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এই রুপ কোন বিশ্বাস ছাড়াই সৃষ্টি রহস্য উদ্ঘাটন করেছেআবার কেউ মনে করেন, সুখী ও কণ্ঠাহীন জীবনযাপনে ঈশ্বরে বিশ্বাস প্রয়োজনএ কথাও ঠিক বলে মনে হয় নাশুধুমাত্র বৌদ্ধরা নন্, পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আছেন, যাঁরা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নন্তাঁরা অন্যান্যদের মত কার্যকারণের নিয়মে কর্মফল ভোগ করে জীবনযাপন করে যাচ্ছেনআবার অনেকে মনে করেন, নিজের মধ্যে শক্তি সঞ্চারের জন্য ঈশ্বরে বিশ্বাস প্রয়োজনকিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাসী নন্, এমন অনেকে আছেন, যাঁরা আত্মবিশ্বাস ও নিজেদের কর্মোদ্যমে বাঁধা-বিপত্তি ও পঙ্গুত্বের অক্ষমতা অতিক্রম করে সফলতার চুড়াঁয় আরোহণ করেছেনআবার কেউ মনে করেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস আত্মমুক্তির সহায়কবুদ্ধ নিজের সাধনলদ্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, প্রতিটি মানুষ মনের কলুষ দূর করে, মৈত্রী করুণার আদেশে জীবনযাপনে প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারেন এবং আপন প্রজ্ঞা শক্তিতে অভিষ্ট লক্ষ্য অজর্ন করতে সক্ষমবুদ্ধ মানুষের দৃষ্টিকে অলৌকিক ঈশ্বর কেন্দ্রিকতা থেকে মানবকেন্দ্রিকতায় ফিরিয়ে এসেছেন এবং আত্মশক্তি দিয়ে নিজ সমস্যা সমাধানে মানুষকে উজ্জিবীত করেছেনপ্রকৃতপক্ষে অলৌকিক কল্পনাশ্রিত শক্তি অপেক্ষা অভিজ্ঞচালক আত্মশক্তি অনেক বেশী শক্তিশালীপ্রাকৃতিক কার্যকারণে, নিজ নিজ শৃদ্ধ অশুদ্ধ জীবনাচরণগত কর্মই প্রত্যক মানুষের শুভ অশুভ কর্মফল প্রদান করেদ্বিতীয় অদৃশ্য কোন শক্তির এখানে ভূমিকা নেই
['অর্থব, উদ্যমহীন অশ্বকে পেছনে ফেলে সক্রিয় উদ্যোগী বেগবান অশ্ব যেমন এগিয়ে চলে, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবানরা তেমনি নিষ্ক্রয়দের মধ্যে সক্রিয়, সুপ্তদের মধ্যে জাগ্রত এবং ক্রোধীদের মধ্যে অক্রোধী হয়ে প্রগতির দিকে এগিয়ে চলে'] 
প্রশ্নঃ- যদি সৃষ্টিকর্তা না থাকে তাহলে বিশ্বমন্ডল হলো কি করে?
উত্তরঃ ঈশ্বরে বিশ্বাসী সব ধর্মই কাল্পনিক ও পৌরনিক কাহিনীর সাহায়্যে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করছেএকবিংশ শতাব্দীতে পদার্থ বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞানের তথ্যের কাছে পৌরনিক কল্পকাহিনী এখন গুরুথ্ব হারিয়ে ফেলেছেবর্তমানে ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়াই সৃষ্টি রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলেছে, যা বৈজ্ঞানিক তথ্যে প্রমাণিত হয়েছে 
প্রশ্নঃ-বিশ্ব মন্ডলের সৃষ্টি সম্পর্কে বুদ্ধ কি বলেছেন?
উত্তরঃ  এ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের ব্যাখ্যা অভিন্ন। "অগ্গঞা সূত্রে" বুদ্ধের ব্যাখ্যা হলো, লক্ষ লক্ষ বছরের দীর্ঘ সময় ব্যাপী প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় সৌরমন্ডল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় সৌরমন্ডলের বর্তমান ঘূর্ণায়মান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছেবিশ্বপ্রকৃতির প্রথম প্রাণীর সৃষ্টি হয় জলে, এককোষী প্রাণী হিসেবেপরবর্তী পর্যায়ে বিবর্তনের মাধ্যমে এককোষী প্রাণী বহুকোষী যৌগিক প্রাণীতে রুপান্তরীত হয় প্রাকৃতিক কার্য-কারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রুপান্তর ঘটেছে, যা বুদ্ধের "প্রতীত্য সমুপাদ সূত্রে"ও দেশিত হয়েছে
প্রশ্নঃ-আপনি বলছেন, সৃষ্টির রহস্য ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়া প্রমাণিত হয়েছেতাহলে অলৌকিক ঘটনাগুলো কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
উত্তরঃ অনেকে বিশ্বাস করেন, অলৌকিক ঘটনাগুলো ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ কিন্তু অলৌকিক উপায়ে কোন রোগ নিরাময় হতে পারে চিকিসা বিজ্ঞানে  সমর্থন পাওয়া যায় নাজনশ্রুতিতে শোনা যায়, কেউ বিপর্যয় থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেনকিন্তু কি প্রক্রিয়ায় তা ঘটেছে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই রোগাক্রান্ত বেঁকে যাওয়া শরীর সোজা হয়ে গেছে, পক্ষাঘাতে অবশ প্রত্যঙ্গ শক্তি ফিরে পেয়েছে ইত্যাদি ঘটনা অলৌকিকভাবে ঘটেছে বলে দাবী করা হলেও চিকিসা বিজ্ঞানের পরীক্ষায়  তার সত্যতা প্রমাণ করে নাজনশ্রুতি, অসমর্থিত দাবী কখনো প্রমাণিত সত্যের বিকল্প হতে পারেনাব্যখ্যা করা যায় না কিংবা প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলে না এমন ঘটনা কখনো কখনো ঘটে থাকেএর ব্যখ্যা করার ক্ষমতা আমাদের জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা প্রমাণ করে, কিন্তু তাতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় নাআধূনিক চিকিসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির আগে রোগে আক্রান্ত হওয়াকে কোন দেবদেবী বা ঈশ্বরের শাস্তি বলে বিশ্বাস করা হতোএখন রোগের কারণ জানা গেছে, রোগাক্রান্ত হলে চিকিসা করে রোগ নিরাময় হয় ভবিষ্যতে আমাদের জ্ঞান পরিধি আরও বিস্তৃত হলে আজকের অজানা অনেক রহস্য উম্মোচিত হবে, যেমন এখন আমরা অনেক রোগের কারণ বুঝতে সক্ষম হয়েছি
প্রশ্নঃ- অনেকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব কোনো না কোনোভাবে বিশ্বাস করেনএখানে সত্য নিহিত আছে, এই কথা কি বলা যায় না?
উত্তরঃ না, তা বলা যায় নাএক সময় ভূ-মন্ডলকে চ্যাপ্ট বলে মনে করা হতো কিন্তু পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছেবিপৃল সংখ্যক মানুষ কিছু বিশ্বাস করে বলে, তা সত্য - এ কথা বলা যায় নাসত্য মিথ্যা নিরুপন করা উচিত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে
প্রশ্নঃ- বৌদ্ধেরা ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলে কিসে বিশ্বাস করেন?
উত্তরঃ আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি নাআমরা মানুষের অপরিমেয় শক্তিতে বিশ্বাস করিআমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষ মূল্যবান এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনন্ত মেধা সুপ্ত আছেকর্মসাধনায় প্রতিটি মানুষ বুদ্ধের মত প্রজ্ঞা লাভ করে কোন বিষয় আসলে যে রকম  ঠিক সেই রকম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হতে পারেনআমরা বিশ্বাস করি, মনের ঈর্ষা, ক্রোধ ও ঘৃণার স্থলে করুণা, ক্ষমা ও মৈত্রীর অনূভূতিতে উজ্জিবীত হয়ে প্রতিটি মানুষ নিজ জ্ঞানশক্তির সাহায্যে জীবন জগতের সকল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষমবুদ্ধ বলেছেন আমাদের অন্য কেউ রক্ষা করতে পারে না, নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়
অজ্ঞতা ধূর করে জ্ঞানের আলোকে জীবনের স্বরুপ জ্ঞাত হয়ে আপন কর্মশক্তির সাহায্যে নিজ নিজ সমস্যা সমাধান করতে হয়বাস্তব অভিজ্ঞতার জ্ঞানাআলোকে বুদ্ধ স্পষ্ট ভাবে সেই পথ চলার সন্ধান দিয়েছেন
প্রশ্নঃ- অন্য ধর্মের অনুসারীরা তাদেঁর দেবদেবীর নির্দেশিত উপায়ে কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা তা নির্ধারণ করেনআপনি তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, কি করে নির্ধারণ করেন- কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা?
উত্তরঃ যে চিন্তা-ভাবনা-বাক্য কিংবা কর্ম ঈর্ষা, লোভ, ঘৃণা ও মোহের শেখরে আবদ্ধ, তা মন্দ ও অমঙ্গলদায়ক এবং নির্বাণের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেযে চিন্তা-ভাবনা-বাক্য বা কর্ম; ত্যাগ, ক্ষমা, মৈত্রী, করুণা ও প্রজ্ঞার শেখরে নিবদ্ধ, তা সত্য, মঙ্গল ও উত্তম এবং নির্বাণের পথে নিয়ে যায়ঈশ্বর নির্ভর ধর্ম দর্শনে আপনাকে যা করতে নির্দেশ দেয়া হয়, তাই করতে হয় কিন্তু মানবকেন্দ্রিক ও যুক্তি নির্ভর বৌদ্ধ দর্শনে নিজের আত্মশক্তির বিচার বিশ্লেষণে, আত্মোপলদ্ধির সাহায্যে কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা, কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ কোনটি মঙ্গলজনক, কোনটি অমঙ্গলজনক তা নির্ধারণ করতে পারেন
জ্ঞান ভিত্তিক নৈতিকতা, আদেশ-নির্দেশ নির্ভর নৈতিকতার চাইতে অবশ্যই অধিকতর শক্তিশালীকেননা প্রথমটি বিচার বিশ্লেষণের উপর, দ্বিতীয়টি বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল
অনুরুপভাবে, কোনটি সত্যাশ্রয়ী, কোনটি মিথ্যাশ্রয়ী, কোনটি নিজের এবং অন্যের জন্য মঙ্গলজনক তা নিরুপনের জন্য বুদ্ধ তিনটি বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার জন্য উপদেশ দিয়েছেনঃ 
১) যদি উদ্দেশ্য সত্যাশ্রয়ী হয় অর্থা যে কর্ম ভালোবাসা ও প্রজ্ঞা উদ্ভূত,
২) যে কর্মফল নিজের সহায়ক হয় অর্থা কর্ম যদি নিজেকে অধিকতর ত্যাগী, মৈত্রীপূর্ণ ও প্রজ্ঞাবান করতে সক্ষম হয়,
৩) যে কর্ম অন্যের জন্য উপকারী অর্থা যে কর্ম অন্যকে অধিকতর ত্যাগী, মৈত্রীভাবাপন্ন ও প্রজ্ঞাবান করতে সাহায্য করে, সেই কর্ম সম্পাদনই সত্যাশ্রয়ী, উত্তম, নৈতিক এবং সর্বাঙ্গীন মঙ্গলময়তবে কার্যকারণ প্রক্রিয়ার সুক্ষ্ম বিচারে আপাতদৃষ্টিতে ব্যতিক্রম থাকতে পারেযেমনঃ স উদ্দেশ্যে কোন কর্ম বাহ্যিক দৃষ্টিতে তা আমার ও অন্যের মঙ্গলদায়ক মনে না হতে পারেআবার কখনো কখনো আমার স উদ্দেশ্যে কৃত কর্ম আমার জন্য মঙ্গলদায়ক হলো, কিন্ত অন্যের জন্য কষ্টদায়ক মনে হতে পারেতবে মিথ্যশ্রয়ী কর্ম সম্পদনের ফল, আমার এবং অন্যের জন্য অবশ্যই কষ্টদায়ক হবেকুশলধর্মী কর্মের ফল আমার এবং অন্যের জন্য সর্বাঙ্গীন মঙ্গলদায়ক হবে উদ্দেশ্য নিয়ে কর্মের ফলপ্রাপ্তি শুধু সময়ের ব্যাপারবুদ্ধ বিচার বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সত্যাশ্রয়ী ও মিথ্যাশ্রয়ী কর্ম সম্পাদনের এবং কর্মফল প্রাপ্তির ব্যাখ্যা করেছেনপ্রকৃতির নিয়ম রাজ্যে কার্যকারণ প্রক্রিয়ার এমন বিধান কার্যকরী, যার প্রভাবেই যথাযথ কর্মের যথাযথ ফলের সৃষ্টি হয়এটিই বুদ্ধের দীর্ঘ ৬বছর কঠোর সাধনালদ্ধ এবং অভিজ্ঞতালদ্ধ সত্যোঘাটন
                                      ...............................................