বৌদ্ধ গান

জয় বৌদ্ধ পতাকা

জয় জয় বৌদ্ধ পতাকা
অহিংসা বিজয় নিশান
গাওরে সকলে ঔক্য বিতানে
অহিংসা মিলন গান।(২)
জয় জয় বৌদ্ধ পতাকা।

আজি বিশ্ব ব্যপিয়া
অহিংসা হিল্লোলে
জাগে মহাবিশ্ব সাম্যমৈত্রী সলিলে।(২)
আকাশে বাতাসে বন উপবনে
নদী কল্লোলে ধরেছে তান।২
জয়......................গান।
জয় জয় বৌদ্ধ পতাকা।

জাতি ভেদাভেদ বৈষম্য হিমাদ্রী
লঙ্গিয়াছিল মহা জলধি।(২)
সকল বন্ধন করি অবসান
গাওরে সকলে ঔক্যবিধান
ছয়রঙেপতাকার শান্তি নিশান
জয় জয়................গান।
জয় জয়................গান।
গাওরে সকলে ঔক্যবিতানে
অহিংসা মিলন গান।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে বৌদ্ধ প্রসঙ্গ

লেখক: ড. তপন বাগচী

উনিশ শতক বাঙালির নবজাগরণের সূচনায় সাহিত্য-সংস্কৃতির উপলব্ধির সঙ্গে ধর্মচিন্তাজাত দার্শনিক উপলব্ধির সংযোগ ঘটে। বৌদ্ধসাহিত্যের অনুবাদ ও সমালোচনা এই উপলব্ধিকে জাগ্রত রাখে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামদাস সেন, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, কেশবচন্দ্র সেন, অঘোরনাথ গুপ্ত, নবীনচন্দ্র সেন, শরচ্চন্দ্র দেব, সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ প্রমুখ মনীষীতুল্য ব্যক্তি বুদ্ধদেবের জীবন ও দর্শন নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। রবীন্দ্রমানস গঠনে এদের চিন্তাাধারা প্রভাব ফেলেছিল। বুদ্ধ সম্পর্কে পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁর অজানা ছিল না। হীনযান-মহাযান সম্পর্কেও তাঁর ধারণা স্পষ্ট ছিল। বুদ্ধদেবকে নিয়ে তাঁর নানামাত্রিক ভাবনা নিয়ে গ্রন্থও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক আবহেও ছিল বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা। তাঁর ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'আর্যধর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের পরস্পর ঘাতপ্রতিঘাত ও সঙ্ঘাত' (১৮৯৯) এবং সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'বৌদ্ধধর্ম' (১৯০১) গ্রন্থদুটিই তার প্রমাণ বহন করে। এছাড়া রাজেন্দ্রলাল মিত্রের 'দি সংস্কৃত বুদ্ধিস্ট লিটারেচার অফ নেপাল' গ্রন্থটি তাঁকে অনেক বৌদ্ধআখ্যানের সন্ধান দেয়। এই গ্রন্থ থেকে কবি যে সকল আখ্যান তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে ব্যবহার করেছেন, তা হলো, শ্রেষ্ঠ 'ভিক্ষা, পূজারিণী, উপগুপ্ত, মালিনী, পরিশোধ, চন্ডালী, মূল্যপ্রাপ্তি, নগরলক্ষ্মী ও মস্তকবিক্রয়। 'কথা ও কাহিনী' কবিতাগ্রন্থের সকল আখ্যানই তিনি গ্রহণ করেছেন বৌদ্ধ কাহিনী থেকে। এই গ্রন্থের আখ্যা-অংশে 'বিজ্ঞাপন' শিরোনামে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য থেকে মেলে-
'এই গ্রন্থে যে-সকল বৌদ্ধ-কথা বর্ণিত হইয়াছে তাহা রাজেন্দ্রনাথ মিত্র-সংকলিত নেপালী বৌদ্ধসাহিত্য সম্বন্ধীয় ইংরাজি গ্রন্থ হইতে গৃহিত। রাজপুত-কাহিনীগুলি টডের রাজস্থান ও শিখ-বিবরণগুলি দুই-একটি ইংরাজি শিখ-ইতিহাস হইতে উদ্ধার করা হইয়াছে। ভক্তমাল হইতে বৈষ্ণব গল্পগুলি প্রাপ্ত হইয়াছি। মূলের সহিত এই কবিতা গুলির কিছু কিছু প্রভেদ লক্ষিত হইবে-আশা করি, সেই পরিবর্তনের জন্য সাহিত্য-বিধান-মতে দন্ডনীয় গণ্য হইব না।'
'কথা ও কাহিনী' গ্রন্থের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কবি অন্যত্র বলেছেন,
'এক সময়ে আমি যখন বৌদ্ধ কাহিনী এবং ঐতিহাসিক কাহিনীগুলি জানলুম তখন তারা স্পষ্ট ছবি গ্রহণ করে আমার মধ্যে সৃষ্টির প্রেরণা নিয়ে এসেছিল। অকস্মাৎ 'কথা ও কাহিনী'র গল্পধারা উৎসের মতো নানা শাখায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। সেই সময়কার শিক্ষায় এই-সকল ইতিবৃত্ত জানবার অবকাশ ছিল, সুতরাং বলতে পারা যায় 'কথা ও কাহিনী' সেই কালেরই বিশেষ রচনা।' [সাহিত্যে ঐতিহাসিকতা, সাহিত্যের স্বরূপ]
'কথা' কাব্যে যে কয়েকটি কবিতা আছে তা হলো: কথা কও, কথা কও, শ্রেষ্ঠভিক্ষা, প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণ, মস্তকবিক্রয়, পূজারিণী, অভিসার, পরিশোধ, সামান্য ক্ষতি, মূল্যপ্রাপ্তি, নগরলক্ষ্মী, অপমান-বর, স্বামীলাভ, স্পর্শমণি, বন্দী বীর, মানী, প্রার্থনাতীত দান, রাজবিচার, গুরু গোবিন্দ, শেষ শিক্ষা, নকল গড়, হোরিখেলা, বিবাহ, বিচারক, পণরক্ষা
আর 'কাহিনী' কাব্যে রয়েছে ৮টি কবিতা। তা হলো: কত কী যে আসে, গানভঙ্গ, পুরাতন ভৃত্য, দুই বিঘা জমি, দেবতার গ্রাস, নিষ্ফল উপহার, দীনদান, বিসর্জন। অর্থাৎ 'কথা' ও 'কাহিনী'র এই ৩৩টি কবিতাই বৌদ্ধকাহিনীজাত। এর বাইরেও অজস্র কবিতা রয়েছে যাতে বৌদ্ধসংস্কৃতির উপকরণ রয়েছে। তবে 'পুনশ্চ' কাব্যের 'শাপমোচন', 'পরিশেষ' কাব্যের 'বুদ্ধজন্মোৎসব', 'বোরোবুদুর', 'সিয়াম, 'বুদ্ধদেবের প্রতি, 'প্রার্থনা, 'বৈশাখী পূর্ণিমা; 'পত্রপুট' কাব্যের ১৭-সংখ্যক কবিতা, 'নবজাতক' কাব্যের 'বুদ্ধভক্তি' এবং 'জন্মদিনে' কাব্যের ৩ ও ৬ সংখ্যক কবিতায় তীব্রভাবে রয়েছে ভগবান বুদ্ধের উপস্থিতি।

জীবন দু:খময়

প্রজ্ঞাদর্পন ডেক্স

পৃথিবীতে চারটি ধ্রুব সত্য আছে। তম্মধ্যে প্রথম সত্য হল দু:খ সত্য। অর্থাৎ জীবনে কোন সুখ নেই জন্মগ্রহণ করলেই দু:খ। এই কথা শুনে অনেকে বৌদ্ধধর্মকে অথবা বুদ্ধকে দু:খবাদী বলে অভিহিত করে থাকেন। কিন্ত তিনি শুধু দু:খ বলে থমকে দাঁড়াননি, তিনি দু:খ থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে হয় তার উপায়ও বলে দিয়েছেন।
আমার একজন কলীগের সাথে প্রায়ই জগৎ সৃষ্টিসহ ধর্মীয় নানা জটিল বিষয়ে আলোচনা হয়ে থাকে। আলোচনা প্রসংঙ্গে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করি পৃথিবীতে বেচেঁ থাকাটা সুখ না দু:খ। তিনি আত্মবিশ্বাসের সহিত বললেন বেচেঁ থাকাটা সুখের। আমি তাকে শ্রদ্ধেয় বনভান্তের দেশনা থেকে একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। কারণ ভোগবিলাসের জগতে বসবাসকারী বন্ধুটি মহান দু:খসত্য আর অনুধাবন করতে পারেন না। সেরূপ আমাদের সমাজে অনেকের কাছেই দৃ:খসত্য উপলদ্ধি হয় না, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় ভোগবিলাসে মত্ত থাকায় কিংবা চেষ্টার অভাবে, নয়তোবা কর্মবিপাকানুযায়ী কল্যাণমিত্রের দর্শন বা সান্নিধ্যের অভাবে।
পৃথিবীতে জন্ম থেকে মৃত্য পর্যন্ত কোন সুখ নেই এমনকি বৌদ্ধদর্শন অনুযায়ী চরম লক্ষ্য নির্বাণ লাভ ব্যতীত মৃত্য পরবর্তী জীবনেও দু:খ পিছু ছাড়ে না।
মায়ের গর্ভে ভ্রুণ হয়ে জন্ম গ্রহণের পর থেকেই জীবের শ্বাস প্রশ্বাস কার্য শুরু হয়। শ্বাস একবার টেনে যদি আর প্রশ্বাস না ফেলা হয় এবং প্রশ্বাস একবার ফেলে যদি আর শ্বাস না টানা হয় তাহলে দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যায় এবং দু:খ সত্য সহজেই অনুভব হয়। আরও বিভিন্নভাবে দু:খসত্য অনুভব করা যায়। অনেকে মনে করে বসে থাকলে সুখ কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলেও দু:খ্,দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো দু:খ, দীর্ঘসময় শোয়াও দু:খ্। এভাবে দেখাযায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দু:খ। এসমস্ত দু:খ হতে পরিত্রাণ পাওয়া যায় যদি নিজের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে জাগ্রত করে দু:খ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী করা যায়। সঠিক পদ্ধতিতে কঠোর ধ্যানানুশীলনের মাধ্যমে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী পূর্বক সকল দু:খকে জয় করে অনাবিল সুখ উপভোগ করা যায়।